তহীদ মনি
আজকাল শহরের ফিলিং স্টেশনগুলোতে গেলে একটি কথা প্রায়ই কানে আসে—"গ্রামের মানুষ শহরে এসে লাইন দিচ্ছে, তাই তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে।" কথাটি শুনলে মনে হতে পারে, গ্রামের মোটরসাইকেল চালকরা বুঝি শখ করে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে শহরের পাম্পে ভিড় জমাচ্ছেন। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে অন্য কথা। বাস্ততবতা হলো, গ্রামীণ জনপদের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ায় বাধ্য হয়েই তারা ছুটছেন শহরের দিকে। প্রশ্ন উঠেছে, গ্রামের হাজার হাজার মোটরসাইকেল তবে চলবে কিসে?
এক সময় খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার শাহপুর, আন্দুলিয়া কিংবা থুক্রবাজারের মতো ছোট ছোট বাজারগুলোতে অন্তত ৫-১০টি পয়েন্টে বোতলে করে পেট্রোল বা অকটেন পাওয়া যেত। গ্রামের একজন কৃষক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে তেলের জন্য দুশ্চিন্তা করতে হতো না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রশাসনের কড়াকড়ি, 'অবৈধ মজুদ' বিরোধী অভিযান আর জরিমানার ভয়ে খুচরা দোকানিরা তেল রাখা ছেড়ে দিয়েছেন। একজন দোকানি তেল কিনতেই পারছেন না, বেচবেন কী?
ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। শাহপুর বা তার আশেপাশের গ্রামের কয়েক শ মোটরসাইকেল চালককে এখন তেল নিতে দৌড়াতে হচ্ছে দৌলতপুর কিংবা ফুলতলায়। যাওয়া-আসায় অন্তত ৩৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পাম্পে গিয়ে আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা—সব মিলিয়ে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার কর্মঘণ্টা। ব্যক্তিগত অর্থের পাশাপাশি অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রের মহামূল্যবান জ্বালানি। মাঠের এই চরম বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কেবল 'শহরের তেল গ্রামে যাচ্ছে' বলে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
নীতিনির্ধারকরা বলছেন সিন্ডিকেট আর মজুদের কথা। কিন্তু গ্রামের ছোট বাজারের সেই পুরনো সরবরাহ ব্যবস্থা সচল না করে কেবল পাম্পের ওপর চাপ কমানো কি সম্ভব? যে মানুষটি আগে বাড়ির পাশের দোকান থেকে তেল নিয়ে কাজ সারতেন, তাকে আজ বাধ্য হয়ে পাম্পে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এতে মানুষের মনে সরকারের প্রতি যেমন বিতৃষ্ণা বাড়ছে, তেমনি স্পষ্ট হচ্ছে প্রশাসনিক অদক্ষতা।
সংকট কাটাতে হলে কেবল দোহাই দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। গ্রামের মানুষের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর একটি সঠিক ও আইনি কাঠামো প্রয়োজন। নতুবা এই বিশৃঙ্খলা কেবল পাম্পের লাইনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও উসকে দেবে। লেখক : সাংবাদিক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)