বিশেষ প্রতিনিধি
হতভাগা সালেহা ছবি:
একটি নদী, একটি পরিচয়হীন দেহ এবং একটি বিচ্ছিন্ন মাথা—এই তিনের আড়ালে চাপা পড়ে ছিল এক মধ্যযুগীয় বর্বরতা। অপরাধীরা ভেবেছিল, মাথা বিচ্ছিন্ন করে দিলে পরিচয় মিলবে না; আর দেহ নদীতে ভাসিয়ে দিলে কোনোদিন তার হদিস পাওয়া যাবে না। কিন্তু তারা জানত না, পিবিআই-এর ডায়েরিতে কোনো ফাইলই চিরকাল ‘অজ্ঞাত’ হিসেবে পড়ে থাকে না। একটি দিকচিহ্নহীন সূত্র থেকে কীভাবে পিবিআই খুনিদের ডেরায় পৌঁছালো, তা কোনো থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম নয়।
দৃশ্যপট
সালেহা বেগম—যিনি জীবনের অধিকাংশ সময় মরুভূমির তপ্ত বালুতে শ্রম দিয়ে স্বপ্ন বুনেছিলেন নিজের পরিবারের সচ্ছলতার জন্য। ২০২৪ সালে যখন তিনি দেশে ফেরেন, তখন তার সঞ্চয়ে ছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা। কিন্তু সেই টাকার ঘ্রাণে পৈশাচিক আনন্দ খুঁজে পায় প্রতিবেশী লালন গাজী। প্রেমের সুড়সুড়ি দিয়ে সালেহাকে ঘর থেকে বের করে আনে সে। পরিবার জানত সালেহা ঢাকায় এক বিত্তশালী চিকিৎসকের বাসায় কাজ করছেন, কিন্তু পর্দার আড়ালে লালন তাকে নিয়ে পিরোজপুরের ইন্দুরকানীর একটি নিভৃত ঘরে শুরু করে ‘সংসার’ নামধারী এক নাটক। তদন্তে জানা যায়, সেই এক বছরে লালন কৌশলে সালেহার ব্যাংক হিসাব থেকে সব টাকা আত্মসাৎ করে নেয়। যখনই টাকার উৎস ফুরিয়ে এল এবং সালেহা বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকলেন, তখনই লালনের ‘প্রেম’ বদলে গেল ‘রক্তলিপ্সায়’।

লালন গাজী সিজার মোল্লা
সেই কালরাত
১৯ আগস্ট, ২০২৪। আকাশ ভেঙে অবিরাম বৃষ্টি আর ঝোড়ো বাতাস বইছে খুলনার বটিয়াঘাটায়। লালন তার মামাতো ভাই সিজার মোল্লাকে সাথে নিয়ে এক চরম মরণফাঁদ পাতে। কৌশলে সালেহাকে বটিয়াঘাটার গজালয়া গ্রামে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
‘এটি ছিল একটি নিখুঁত ‘অপারেশন ক্লুলেস’। যেখানে একটি মাথার
অভাবে লাশটি পরিচয়হীন হয়ে পড়েছিল, সেখানে পিবিআই-এর
ধৈর্য আর আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণে খুনিরা আজ শিকলবন্দি
রেশমা শারমিন
পুলিশ সুপার, পিবিআই, খুলনা
পরিকল্পনাটি ছিল ঠান্ডা মাথার। বৃষ্টির শব্দকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সিজারের আনা রশি দিয়ে সালেহার গলায় ফাঁস দেয় লালন। মৃত্যুর সেই শেষ মুহূর্তে সালেহার বাঁচার আকুতি হয়তো বাতাসের গর্জন ছাপিয়ে আকাশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল, কিন্তু খুনিদের মনে দয়া উদয় হয়নি। শ্বাসরোধ করে হত্যার পর তারা এক চরম বীভৎসতার আশ্রয় নেয়। লাশের পরিচয় যেন কোনোভাবেই শনাক্ত না করা যায়, সে জন্য সিজারের নিয়ে আসা ধারালো হাঁসুয়া দিয়ে সালেহার মাথাটি ধড় থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। দেহটি ছুড়ে ফেলা হয় ভদ্রা নদীতে, আর মাথাটি নিয়ে যাওয়া হয় অন্য কোথাও গুম করতে।
ছদ্মবেশে তদন্ত
পিবিআই-এর একটি দল সাধারণ পোশাকে হানা দেয় পিরোজপুরের চাড়াখালী গ্রামে। সেখানে গিয়ে জানা যায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। লালন গাজী ও সালেহা বেগম সেখানে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া থাকতেন। কিন্তু ১৯ আগস্ট থেকে তারা উধাও। বাড়িওয়ালা জানালেন, তারা খুলনায় যাওয়ার কথা বলে ঘর ছেড়েছিলেন। রেজোয়ানের অনুসন্ধানী চোখ লক্ষ্য করল, লালন ও সালেহা—দুজনের ফোনই ১৯ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ঠিক একই সময়ে বন্ধ হয়েছে। এটি ছিল তদন্তের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
‘বেওয়ারিশ’ লাশ ও স্মৃতির টুকরো
লালন ও সালেহা যদি ১৯ আগস্ট খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে থাকেন, তবে মাঝপথে কী ঘটেছিল? এসআই রেজোয়ান বটিয়াঘাটা থানায় যোগাযোগ করে জানতে পারেন, ২০ আগস্ট বিকেলে ঝপঝপিয়া নদী থেকে এক অজ্ঞাত নারীর মাথাবিহীন লাশ উদ্ধার হয়েছে। লাশটি তখন ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করা হয়ে গেছে।
রেজোয়ান দমে যাননি। তিনি পুলিশের নথিতে থাকা সেই লাশের ছবি এবং লাশের গায়ে থাকা কাপড় ও কানের দুলের ছবি নিয়ে হাজির হন সালেহার ছেলের কাছে। ছবিগুলো দেখামাত্রই কান্নায় ভেঙে পড়েন ছেলে— ওগুলো তার মায়েরই ছিল। কিন্তু মাথা ছাড়া লাশ কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়? পিবিআই তখন ডিএনএ টেস্টের সিদ্ধান্ত নেয়। ফরেনসিক রিপোর্ট যখন নিশ্চিত করল যে উদ্ধার হওয়া সেই মাথাবিহীন দেহটিই সালেহা বেগমের, তখন মামলাটি ‘অপহরণ’ থেকে ‘খুন’-এ রূপ নেয়।
হাওরের বিড়াল-ইঁদুর খেলা
সালেহার লাশের পরিচয় মিলল, কিন্তু মূল সন্দেহভাজন লালন গাজী কোথায়? সে তখন কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেছে। লালন ছিল অতি চতুর; সে পুলিশি নজরদারি এড়াতে প্রতিদিন নতুন নতুন সিম ও মোবাইল সেট ব্যবহার করতে শুরু করে। পিবিআই-এর গোয়েন্দারা টানা ৪০ দিন তার ডিজিটাল পায়ের ছাপ অনুসরণ করেন। দেখা যায়, সে একবার সুনামগঞ্জের হাওরে, পরক্ষণেই কিশোরগঞ্জের দুর্গম এলাকায়।
অবশেষে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার এক খেয়াঘাটে পিবিআই পেতে রাখে এক অদৃশ্য জাল। এসআই রেজোয়ানের টিম টানা কয়েক রাত নির্ঘুম কাটিয়ে সেখানে ওত পেতে থাকে। যখন এক শ্রমিকবেশী ব্যক্তি মুখ লুকিয়ে খেয়া পার হতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পিবিআই-এর চিল দৃষ্টি তাকে শনাক্ত করে। ঝাপটে ধরা হয় লালন গাজীকে।
মাটি খুঁড়ে বেরোলো ‘ঘর’
গ্রেপ্তারের পর লালনের জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে সেই পৈশাচিক খুনের বর্ণনা। সে স্বীকার করে, মামাতো ভাই সিজার মোল্লাই ছিল তার এই অপারেশনের মাস্টারমাইন্ড ও জল্লাদ। লালন ধরা পড়ার পরপরই পিবিআই ঢাকার হাতিরঝিলে অভিযান চালিয়ে সিজারকে গ্রেপ্তার করে।
এরপর আসে তদন্তের চূড়ান্ত ধাপ। সিজারের তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরের বাড়ির উঠান খনন করে উদ্ধার করা হয় সালেহার ব্যবহৃত যাবতীয় আসবাবপত্র ও কাপড়। খুনিরা এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, তারা ভেবেছিল এই আলামতগুলো কোনোদিন মাটির গভীর থেকে আলো দেখবে না।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার রেশমা শারমিনের ভাষায়, এটি ছিল একটি নিখুঁত ‘অপারেশন ক্লুলেস’। যেখানে একটি মাথার অভাবে লাশটি পরিচয়হীন হয়ে পড়েছিল, সেখানে পিবিআই-এর ধৈর্য আর আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণে খুনিরা আজ শিকলবন্দি। ২০ লাখ টাকার লোভ আর বিশ্বাসঘাতকতার এই গল্পের শেষ হয়েছে পিবিআই-এর এক বিশাল বিজয়ে।