ধ্রুব ডেস্ক
বিশ্ব দৃষ্টি দিবস আজ। ‘লাভ ইউর আইস’ বা ‘চোখকে ভালোবাসুন’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে দিবসটি। চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, চোখ নিয়মিত পরীক্ষা করা, প্রয়োজন অনুযায়ী চশমা পরার অভ্যাস এবং ছানি শনাক্ত হলে দ্রুত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেই অধিকাংশ অন্ধত্ব রোধ করা সম্ভব। তবে বাংলাদেশে চিকিৎসাযোগ্য অন্ধত্বের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষ ছানি সার্জনের চরম সংকট।
দেশে দৃষ্টিহীনতার প্রায় ৮০ শতাংশ বা চার-পঞ্চমাংশ ঘটনার পেছনে মূল কারণ ছানি। বর্তমানে অন্তত ১০ লাখ রোগী ছানি অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকলেও বিপরীতে কাজের ক্ষেত্রে প্রস্তুত ও অভিজ্ঞ সার্জন আছেন মাত্র ৪০০ থেকে ৮০০ জন (যদিও দেশে নিবন্ধিত চক্ষু বিশেষজ্ঞ দুই হাজারেরও বেশি)। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ৮ ৩৩ জন ছানি রোগীর চিকিৎসায় সার্জন আছেন মাত্র একজন। এর সঙ্গে প্রতি বছর আরও এক লাখের বেশি নতুন রোগী এই তালিকায় যুক্ত হয়ে সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছেন।
গ্রামীণ এলাকা ও নারীরা সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে
চিকিৎসকদের মতে, কেবল দক্ষ সার্জনের অভাবই একমাত্র কারণ নয়; প্রান্তিক অঞ্চলে চিকিৎসাসেবার পৌঁছাতে না পারা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তে দুর্বলতা, সামাজিক অসচেতনতা এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এই সংকটকে ঘনীভূত করছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮টি জেলার প্রায় সাড়ে ২১ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপে ছানি অস্ত্রোপচারের হার পুরুষদের ক্ষেত্রে ৭৬.৬ শতাংশ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৬৪.৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী জানান, দেশে বর্তমানে জমতে জমতে ছানিজনিত অন্ধত্বের প্রায় ১০ লাখ ব্যাকলগ তৈরি হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে বছরে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ রোগী অস্ত্রোপচারের সেবা পান, কিন্তু নতুন রোগী যোগ হওয়ায় ঘাটতি মেটানো যাচ্ছে না। জমে থাকা ব্যাকলগ কমাইতে হলে আগামী ৫ বছর প্রতিবছর অতিরিক্ত অন্তত দুই লাখ অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। এজন্য ঢাকার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে জেলা হাসপাতালগুলোকে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে সক্ষম করতে হবে।
চাপের মুখে প্রধান চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার রোগী সেবার উদ্দেশ্যে উপস্থিত হন। মাত্র ২৫০ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়ে বিশাল সংখ্যক এই রোগীর সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটিকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২০-১৩০ জনের নিখরচায় (বিনামূল্যে লেন্সসহ) ছানি অস্ত্রোপচার করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক ডা. রেজওয়ানুর রহমান উল্লেখ করেন, চোখের প্রাকৃতিক লেন্স ঘোলা হয়ে আসা, ঝাপসা বা কুয়াশাচ্ছন্ন দেখা এবং দিনের তীব্র আলো বা গাড়ির হেডলাইটের সামনে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া ছানির স্পষ্ট উপসর্গ। তবে অধিকাংশ বয়স্ক ও প্রবীণ গ্রামীণ মানুষ দৃষ্টি কমে যাওয়াকে বয়সের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মনে করে অবহেলা করেন। আবার হাসপাতালে যাতায়াতের আর্থিক সামর্থ্য না থাকা এবং সহায়কের অভাবেও অনেকে চিকিৎসার বাইরে থেকে যান।
দুই দশকে অগ্রগতি ও চশমার তীব্র ঘাটতি
'জাতীয় অন্ধত্ব জরিপ-২০২০' অনুসারে, গত ২০ বছরে বাংলাদেশে অন্ধত্বের হার ১.৫৩ শতাংশ থেকে কমে ১ শতাংশে নেমে এসেছে, অর্থাৎ প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। তবে ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনও প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ সম্পূর্ণ অন্ধত্ব নিয়ে বসবাস করছেন, যার ৫ লক্ষাধিকের মূল কারণ ছানি।
অন্যদিকে, শুধু ছানিই নয়, সঠিক চশমার অভাবও দৃষ্টির সমস্যার পেছনে একটি বড় কারণ। দেশের ৪৮.৬ শতাংশ মানুষের চোখের স্পষ্ট দৃষ্টিত্রুটি থাকলেও নিয়মিত চশমা ব্যবহারের সুযোগ পান মাত্র ২৬ শতাংশ।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা জানান, সরকারের লক্ষ্য হলো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন রয়েছে এমন সব ছানি রোগীকে সেবার আওতায় আনা। এজন্য প্রান্তিক পর্যায়ে জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদায়নের মাধ্যমে চশমার পাওয়ার নির্ধারণ, ছানি ও নেত্রনালির মতো রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণের কাজ বেগবান করা হচ্ছে।