Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

সেই ‘ভুতুড়ে শহর’ ‘জ্বিনের বাদশা’র দখলে

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট,২০২৬, ১১:১৭ এ এম
সেই ‘ভুতুড়ে শহর’ ‘জ্বিনের বাদশা’র দখলে

দূর থেকে এই শহরকে মনে হয় যেন সমুদ্রের ধারে সারি সারি অভিন্ন সাদা ভবনের কোনো কৃত্রিম নগরী। কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র—নীরব রাস্তা, ফাঁকা উঁচু ভবন এবং ধুলায় ঢাকা পরিত্যক্ত অ্যাপার্টমেন্ট।

মালয়েশিয়ার উপকূলে সিঙ্গাপুরের কাছেই গড়ে তোলা হয়েছিল বিশাল এই আবাসন প্রকল্প ‘ফরেস্ট সিটি’। ২০১৬ সালে চীনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কান্ট্রি গার্ডেন প্রকল্পটি উদ্বোধন করে একে ‘সমগ্র মানবজাতির স্বপ্নের স্বর্গ’ হিসেবে তুলে ধরেছিল। প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের এই মেগা-প্রকল্পে ১৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় সাত লাখ মানুষের বসবাসের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এক দশক পরও সেখানে বসবাসকারীর সংখ্যা সেই লক্ষ্যের ১ শতাংশেরও কম বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বুধবার (১২ আগস্ট) বিবিসির প্রতিবেদন বলা হয়—এই শহরে প্রথম দিকের বিনিয়োগকারীদের একজন জেসন ডেং পাঁচটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন বিপুল অর্থ ব্যয়ে। এখন তাঁর আফসোস, প্রকল্পটি এতটা বাজে হবে জানলে তিনি এতগুলো সম্পত্তি কিনতেন না।

এদিকে প্রায় জনশূন্য এই পরিবেশই এখন ফরেস্ট সিটিকে ভিন্ন ধরনের ‘আকর্ষণীয়’ জায়গায় পরিণত করেছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি মালয়েশিয়ার পুলিশ সেখানে দুটি প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এই চক্রকে বাংলাদেশে জ্বিনের বাদশাহ বলে।  ৩২টি স্থাপনায় চালানো এই অভিযানে ৩৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জব্দ করা হয় প্রায় ১০ লাখ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত মূল্যের সম্পদ, যার মধ্যে ছিল ৩১৩টি কম্পিউটার, ১ হাজার ৫৫৭টি মোবাইল ফোন, ১৭টি ল্যাপটপ ও ১০টি মডেম।

পুলিশের অভিযোগ, এসব জায়গা থেকে আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগ ও প্রেমের সম্পর্কের নামে প্রতারণা চালানো হচ্ছিল। একটি কল সেন্টারই একটি আবাসিক টাওয়ারের পাঁচ তলায় ২৭টি অ্যাপার্টমেন্ট জুড়ে পরিচালিত হচ্ছিল। আরেকটি কেন্দ্র ছিল পাঁচটি বাংলোয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ৩০৯ জন চীনা, ১৯ জন ইন্দোনেশীয়, তিনজন মালয়েশীয় ও চারজন মিয়ানমারের নাগরিক। জোহর পুলিশের প্রধান আব রহমান আরসাদ জানিয়েছেন, চক্রটির মূল হোতাকে শনাক্ত করতে ইন্টারপোলের সঙ্গে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি হয়তো আরও বড় একটি অপরাধী নেটওয়ার্কের কেবল দৃশ্যমান অংশ। ক্রিপ্টো অপরাধ বিশ্লেষক জন ওয়াজিকের ভাষায়, আধুনিক প্রতারণা চক্রগুলো এখন আর প্রচলিত অপরাধী গ্যাংয়ের মতো নয়; অনেক ক্ষেত্রে তারা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালিত হয়। তাদের আলাদা নিয়োগ দল, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, অর্থপাচার বিশেষজ্ঞ এবং নিজস্ব অবকাঠামো রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফরেস্ট সিটির এসব চক্রের সঙ্গে কম্বোডিয়ার প্রতারণা শিল্পের যোগসূত্র থাকতে পারে। গত কয়েক বছরে কম্বোডিয়া আন্তর্দেশীয় অনলাইন প্রতারণার অন্যতম প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। সেখানে পাচারের শিকার বহু মানুষকে জোর করে প্রতারণার কাজে নিয়োজিত করা হয়। তবে সাম্প্রতিক অভিযানের পর কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় তিন লাখ মানুষ কম্বোডিয়া ছেড়েছে বলে দেশটির কর্তৃপক্ষের হিসাব।

ফরেস্ট সিটির চিত্র অবশ্য কম্বোডিয়া বা মিয়ানমারের কুখ্যাত সাইবার প্রতারণা কম্পাউন্ডগুলোর চেয়ে আলাদা। এখানে কথিত প্রতারণা কেন্দ্রগুলো ছিল সাধারণ আবাসিক ভবন ও বাংলোয়—যেখানে পাশের ফ্ল্যাটেই বসবাস করতেন সাধারণ মানুষ।

ফরেস্ট সিটির সম্পত্তি বিক্রয়কর্মী কেভিনের দাবি, এখনো কিছু কনডোমিনিয়াম ও সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্টে প্রতারণা কার্যক্রম চলছে। তাঁর মতে, শহরটির জনশূন্যতাই অপরাধীদের জন্য বড় সুবিধা। কোম্পানি যেখানে ২৩ হাজার বাসিন্দার কথা প্রচার করে, বাস্তবে সেখানে পাঁচ হাজারেরও কম মানুষ বসবাস করেন বলে তিনি দাবি করেন।

ফরেস্ট সিটির পতনের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। কোভিড মহামারি, চীনের আবাসন খাতের সংকট এবং নাগরিকদের বিদেশে অর্থ বিনিয়োগের ওপর বিধিনিষেধ প্রকল্পটির উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাকে বড় ধাক্কা দেয়। মূল পরিকল্পনার মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে বলে জানা যায়।

বিশেষজ্ঞ ওয়াজিকের মতে, আধুনিক অবকাঠামো, বিপুলসংখ্যক খালি ফ্ল্যাট, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বিলাসবহুল নগরীর ভাবমূর্তি—সব মিলিয়ে ফরেস্ট সিটি প্রতারকদের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। বৈধ ব্যবসার আবরণে অপরাধী কর্মকাণ্ড লুকিয়ে রাখা তাদের কাজকে শনাক্ত করাও কঠিন করে তোলে।

তবে ফরেস্ট সিটি মালয়েশিয়ায় এই ধরনের অপরাধের প্রথম উদাহরণ নয়। ২০২২ সালেও জোহর, পেনাং ও কুয়ালালামপুরে বাংলো ও কনডোমিনিয়াম থেকে পরিচালিত একাধিক প্রতারণা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছিল।

তবু শহরটিতে এখন ধীরে ধীরে মানুষের আনাগোনা বাড়ছে। সিঙ্গাপুর থেকে আসা বাসিন্দা ফিলিপের মতে, কয়েক মাস আগেও ২০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে হয়তো একটিতে আলো জ্বলত; এখন পাঁচটির মধ্যে একটিতে আলো দেখা যায়। তার চোখে ফরেস্ট সিটি ধীরে ধীরে ‘ভুতুড়ে শহর’ থেকে জীবন্ত নগরীতে পরিণত হচ্ছে।

কিন্তু এই পরিবর্তনের আড়ালে যদি সংগঠিত প্রতারণা চক্রও জায়গা করে নেয়, তাহলে ফরেস্ট সিটির বিলাসবহুল স্বপ্নের শহর হয়ে ওঠার গল্পটি আরও অস্বস্তিকর এক বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।
 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)