হাবিবুল্লাহ বিলালী তুহিন
হাবিবুল্লাহ বিলালী তুহিন ছবি: ফাইল
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তাদের পদক্ষেপ ও সফলতা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। জনসংখ্যাকে বোঝায় না রেখে কীভাবে তা জনসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তার চমৎকার সব উদাহরণ তৈরি করেছে এই দেশগুলো।
এক্ষেত্রে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে ভারত সরকারি ও বেসরকারি যেসব যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে তার দু একটা না বল্লেই নয়। প্রথমত সরকারি পর্যায়ে গৃহীত পদক্ষেপ-
এক. জিএসটি (GST - Goods and Services Tax) চালু করা: ২০১৭ সালে ভারতজুড়ে ‘এক দেশ, এক কর’ নীতিতে পণ্য ও পরিষেবা কর (GST) চালু করা হয়। এটি ভারতের জটিল ও বহুস্তরীয় কর ব্যবস্থাকে সহজ করে তোলে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য সহজ হয়েছে এবং কর ফাঁকি কমেছে।
দুই. ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং ইউপিআই (UPI): ডিজিটাল পেমেন্ট বিপ্লব বা ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI) ভারতের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। এর মাধ্যমে কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। এটি নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।
তিন. মেক ইন ইন্ডিয়া (Make in India) ও পিএলআই স্কিম: ভারতকে বৈশ্বিক উৎপাদন হাবে (Manufacturing Hub) পরিণত করার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে 'মেক ইন ইন্ডিয়া' প্রকল্প শুরু হয়। পরবর্তীতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রোডাকশন লিংকড ইনসেনটিভ (PLI) স্কিম চালু করা হয়। এর ফলে ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি এবং ওষুধ শিল্পে বিপুল পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ আসছে।
চার. অবকাঠামো উন্নয়ন (গতি শক্তি ও জাতীয় মহাসড়ক প্রকল্প): পরিবহন ও লজিস্টিকস খরচ কমানোর জন্য ভারত সরকার সড়ক, রেল, বন্দর এবং বিমানঘাঁটি নির্মাণে রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ করছে। 'পিএম গতি শক্তি' মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হচ্ছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করেছে।
ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কেবল সরকারি নীতির ওপর নির্ভর করেনি, বরং দেশের বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ এবং উদ্যোক্তাদের নেওয়া নানা উদ্যোগও এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বেসরকারি খাতের গৃহীত সবচেয়ে প্রভাবশালী পাঁচটি পদক্ষেপ-
১. তথ্যপ্রযুক্তি (IT) ও সফটওয়্যার বিপ্লব: টিসিএস (TCS), ইনফোসিস (Infosys), এবং উইপ্রো (Wipro)-এর মতো বেসরকারি আইটি জায়ান্টগুলোর বিশ্ববাজার জয় ভারতের অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছে। এটি ভারতকে বিশ্বের অন্যতম বড় আউটসোর্সিং ও সফটওয়্যার রফতানিকারক হাবে পরিণত করেছে, যা প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে।
২. সাশ্রয়ী ডেটা এবং টেলিকম বিপ্লব (Jio ও অন্যান্য): ২০১৬ সালে বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স জিও (Reliance Jio)-র বাজারে প্রবেশ ভারতের ডিজিটাল ল্যান্ডস্কেপ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। অত্যন্ত কম খরচে ৪জি এবং পরবর্তীতে ৫জি ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার কারণে কোটি কোটি ভারতীয় ইন্টারনেটের আওতায় আসে। এই "ডিজিটাল লাইফস্টাইল" ই-কমার্স, অনলাইন পেমেন্ট এবং কন্টেন্ট ইকোনমিকে এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
' ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কেবল সরকারি নীতির ওপর নির্ভর করেনি, বরং দেশের বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ এবং উদ্যোক্তাদের নেওয়া নানা উদ্যোগও এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।'
৩. স্টার্টআপ ও ইউনিকর্ন (Unicorn) সংস্কৃতির বিকাশ: ফ্লিপকার্ট, পেটিএম, সুইগি বা জোম্যাটোর মতো হাজার হাজার বেসরকারি স্টার্টআপ গত এক দশকে ভারতে নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরি করেছে। ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম, যা বিপুল পরিমাণ বিদেশী ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (VC) বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে এবং লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে।
৪. নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ প্রযুক্তিতে বিশাল বিনিয়োগ: ভারতের বড় বড় বেসরকারি কর্পোরেট গ্রুপগুলো (যেমন আদানি গ্রিন, টাটা পাওয়ার, রিলায়েন্স) জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই অর্থনীতি গঠনে রেকর্ড পরিমাণ নিজস্ব মূলধন বিনিয়োগ করছে। সৌর এবং বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রিন হাইড্রোজেন ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) প্রযুক্তিতে বেসরকারি খাতের এই বিপুল অংশগ্রহণ ভারতকে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করছে।
৫. ফার্মাসিউটিক্যালস বা 'বিশ্বের ওষুধের দোকান' হিসেবে আত্মপ্রকাশ: ভারতের সান ফার্মা, ডক্টর রেড্ডিস বা সিপলার মতো বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলো জেনেরিক (Generic) বা সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ তৈরিতে বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করেছে। বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ করে ভারতের বেসরকারি ফার্মাসিউটিক্যালস খাত দেশের রফতানি বাণিজ্যকে অত্যন্ত শক্তিশালী করেছে।
বেসরকারি খাতের এই কর্পোরেট ক্যাপেক্স (Capex বা মূলধনী ব্যয়) বৃদ্ধির ফলেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
আরও পড়ুন-
মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব: দ্বান্দ্বিকতা ও জীবনের আখ্যান
চীনের সরকারি বেসরকারি গৃহীত পদক্ষেপ সমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিক-
১. অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি (Open Door Policy): ১৯৭৮ সালে চীনের তৎকালীন নেতা দেং শিয়াওপিং এই নীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করেন।
২.বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) গঠন: বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং উৎপাদন বাড়াতে চীন তার উপকূলীয় অঞ্চলে বেশ কিছু 'স্পেশাল ইকোনমিক জোন' বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলে (যেমন: শেনঝেন)। এই অঞ্চলগুলোতে কর মওকুফ এবং সস্তা শ্রমের ব্যবস্থা করায় বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি সেখানে কারখানা স্থাপন করে। ফলে চীন "বিশ্বের কারখানা" (Workshop of the World) হিসেবে পরিচিতি পায়।
৩. কৃষি খাতের সংস্কার (Household Responsibility System): চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ শুরু হয়েছিল কৃষি খাত দিয়ে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।
৪. অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ: চীন তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, বন্দর, বুলেট ট্রেন এবং বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। একই সাথে তারা সস্তা নকল পণ্য তৈরির ইমেজ থেকে বের হয়ে নিজস্ব উন্নত প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ৫জি (5G) এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থান দখল করার জন্য প্রযুক্তিতে ব্যাপক সরকারি অনুদান ও সহযোগিতা প্রদান করেছে।
৫. বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (Belt and Road Initiative - BRI): এটি চীনের একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বৈশ্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন কৌশল। প্রাচীন সিল্ক রোডের আদলে বিশ্বের প্রায় ১৪০টিরও বেশি দেশের সাথে স্থল ও জলপথে বাণিজ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য চীন কাজ করছে। এর মাধ্যমে চীন তাদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য নতুন বাজার তৈরি করছে এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।
চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে শুধু সরকারি উদ্যোগই নয়, বরং বেসরকারি খাতকে (Private Sector) শক্তিশালী ও বিকশিত করতে দেশটির সরকার বেশ কিছু যুগান্তকারী নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে চীনের জিডিপির ৬০%-এর বেশি এবং শহুরে কর্মসংস্থানের ৮০%-এর বেশি আসে এই বেসরকারি খাত থেকে।
বেসরকারি খাতের বিকাশে চীনের গৃহীত প্রধান পদক্ষেপ সমূহ -
'বেসরকারি অর্থনীতি উন্নয়ন আইন' (Private Economy Promotion Law) প্রণয়ন: বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আইনি সুরক্ষা দিতে এবং সরকারি ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মতো সমান অধিকার নিশ্চিত করতে চীন এই বিশেষ আইন কার্যকর করেছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি খাতের সম্পত্তি ও মেধা স্বত্বের (Intellectual Property) কঠোর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বাজার প্রবেশাধিকারের বৈষম্য দূরীকরণ (Negative List System): অতীতে অনেক বড় বড় খাতে কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া অধিকার ছিল। চীন সরকার একটি 'নেগেটিভ লিস্ট' বা নেতিবাচক তালিকা তৈরি করে তা ক্রমান্বয়ে ছোট করে এনেছে। এর ফলে পরিবহন, জ্বালানি ও বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SMEs) জন্য কর মওকুফ ও ভর্তুকি: চীনের বেসরকারি খাতের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা। এদের টিকিয়ে রাখতে ও উৎসাহিত করতে সরকার কর ছাড় (Tax Cuts), সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারি ভর্তুকি এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের সুবিধা বৃদ্ধি করেছে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বেসরকারি খাতকে মূল চালিকাশক্তি করা: চীনের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ৭০%-এর বেশি অবদান বেসরকারি খাতের (যেমন: আলিবাবা, টেনসেন্ট, বিওয়াইডি, ডিজেআই)। সরকার এই বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) এবং গ্রিন টেকনোলজি নিয়ে কাজ করার জন্য বিশেষ তহবিল, গবেষণাগার এবং ওয়ান-স্টপ টেকনিক্যাল সার্ভিস সেন্টার দিয়ে সহায়তা করছে।
'প্রাইভেট ইকোনমি ডেভেলপমেন্ট ব্যুরো' গঠন: বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমস্যা সরাসরি শোনা এবং দ্রুত সমাধান করার পাশাপাশি একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বেসরকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পলিসি ফিডব্যাক এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অভিযোগ গ্রহণ করে তা সমাধান করে।
এছাড়া ভিয়েতনাম, পাকিস্তানের মত জনবহুল দেশও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে বাংলাদেশের মত দরিদ্র জনবহুল দেশ কিভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে তাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক পরিবর্তন কিভাবে আনা যায় সেটাই আজ আলোচনার মূল বিষয়। আসুন ধীরে ধীরে আমরা আলোচনা এগিয়ে নেয়।
বাংলাদেশের মতো একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর এবং উন্নয়নশীল দেশে শিল্পকারখানায় তথ্যপ্রযুক্তির (IT) ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (4IR) ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বড় দ্বিমুখী বাস্তবতা বা প্যারাডক্স সামনে আসে। একদিকে আছে বিপুল শ্রমশক্তিকে কর্মসংস্থান দেওয়ার তাগিদ, অন্যদিকে আছে বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার জন্য উৎপাদনশীলতা ও নিখুঁত মান নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিল্প খাতের টিকে থাকা এবং প্রবৃদ্ধির জন্য তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার কেন এবং কীভাবে করা উচিত-
কেন দরিদ্র ও জনবহুল দেশেও আইটি ও অটোমেশন অপরিহার্য?
সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে মানুষের চাকরি কমবে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার না করার ক্ষতি আরও ভয়াবহ:
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা: ভিয়েতনাম, ভারত বা চীনের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো আইটি ও উন্নত অটোমেশন ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনছে এবং কাপড়ের মান নিখুঁত করছে। আমরা যদি সনাতন পদ্ধতিতে পড়ে থাকি, তবে বায়াররা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ফলে পুরো শিল্পটাই বন্ধ হয়ে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারে।
শ্রমিকের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস: ভারী ম্যানুফ্যাকচারিং, কেমিক্যাল বা বয়লার চালিত কারখানায় মানুষের কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই জায়গাগুলোতে আইটি সেন্সর এবং দূরনিয়ন্ত্রিত রোবোটিক সিস্টেম ব্যবহার করলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব।
অপচয় রোধ ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি: তথ্যপ্রযুক্তির (যেমন: ERP সফটওয়্যার, সাপ্লাই চেইন ট্র্যাকিং) মাধ্যমে কাঁচামালের অপচয় কমানো যায়। একটি দরিদ্র দেশের জন্য সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুন-
বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের শেকড় ও ভবিষ্যৎ
জনবহুল দেশের উপযোগী "ইনক্লুসিভ টেকনোলজি" মডেল
বাংলাদেশকে এমন প্রযুক্তি বেছে নিতে হবে যা মানুষকে প্রতিস্থাপন (Replace) করবে না, বরং মানুষের ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে (Augment) দেবে। একে বলা হয় "হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ" অটোমেশন।
কোবটস (Cobots) বা সহযোগী রোবট: কারখানায় সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় রোবটের বদলে 'কোবট' বা কোলাবোরেটিভ রোবট ব্যবহার করা। এই রোবটগুলো মানুষের পাশাপাশি কাজ করে। যেমন: ভারী ওজন তোলা বা কাটিংয়ের কাজ করবে রোবট, আর তা সুপারভাইজ এবং নিখুঁত করার কাজ করবে মানুষ।
স্মার্ট ডেটা চালিত সিদ্ধান্ত: কারখানার ফ্লোরে আইওটি (IoT) সেন্সর বসিয়ে প্রতিদিনের উৎপাদনের লাইভ ডেটা ড্যাশবোর্ডে নিয়ে আসা। এতে সাধারণ ম্যানেজার বা সুপারভাইজাররা খুব দ্রুত বুঝতে পারবেন কোথায় উৎপাদনের গতি কম এবং সেই অনুযায়ী জনবল পুনর্বন্টন করতে পারবেন।
কৃষি ও গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্পে আইটি: শুধু বড় কারখানায় নয়, দেশের কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হওয়া কৃষিভিত্তিক শিল্প ও কুটির শিল্পে (যেমন: তাঁত শিল্প, দুগ্ধ খামার, কৃষি পার্টস, টু হুইলার, থ্রি হুইলার, ফোর হুইলার গাড়ি বিভিন্ন পার্টস) অ্যাপ ও ক্লাউড-ভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ছড়িয়ে দেওয়া। এর মাধ্যমে সরাসরি কৃষকরা বা ভোক্তারা বাজারের সঠিক মূল্য জানতে পারবেন এবং ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমবে।
ব্যাপক আইটি ব্যবহারের ফলে উদ্ভূত সামাজিক চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ
শিল্পে প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে দুটি বড় সংকট তৈরি হবে, যার সমাধানও সমান্তরালভাবে করতে হবে:
দক্ষতার বিভাজন (Skill Gap): অদক্ষ শ্রমিকরা কাজ হারাবেন এবং আইটি জানা তরুণদের চাহিদা বাড়বে।
সমাধান: কারখানার ভেতরেই সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে 'রি-স্কিলিং (Reskilling) হাব' তৈরি করা। একজন সাধারণ সেলাই অপারেটরকে ৩ মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে ডিজিটাল নিটিং মেশিনের প্রোগ্রামার বা অপারেটর হিসেবে রূপান্তর করা।
প্রযুক্তি আমদানির খরচ: আমাদের মতো দেশের জন্য উন্নত সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যার বিদেশ থেকে কেনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
সমাধান: দেশীয় আইটি সেক্টরকে ইনসেন্টিভ দেওয়া যেন তারা দেশীয় শিল্পের উপযোগী সুলভ মূল্যের কাস্টমাইজড সফটওয়্যার (যেমন: বাংলা ইন্টারফেসযুক্ত ইনভেন্টরি ও প্রোডাকশন ট্র্যাকার) তৈরি করতে পারে।
মোটকথা- জনবহুল বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কর্মসংস্থান ধ্বংসের কারণ নয়, বরং বর্তমান কর্মসংস্থানকে টিকিয়ে রাখার এবং নতুন ধরনের উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান তৈরির একমাত্র হাতিয়ার। প্রযুক্তিকে শত্রু না ভেবে একে শ্রমশক্তির 'সহায়ক শক্তি' হিসেবে গ্রহণ করাই হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বাস্তবমুখী প্রগতিশীল পদক্ষেপ। সফট স্কিল বা দক্ষতাবৃদ্ধি জন্য শুধু কারিগরি ু, সমস্যা সমাধান (Problem-solving), সংকটময় চিন্তন (Critical thinking) এবং দলগত কাজের দক্ষতা বাড়াতে জোর দিতে হবে।
জীবনব্যাপী শিক্ষা (Lifelong Learning) কার্যক্রমের জন্য গতানুগতিক দীর্ঘমেয়াদী ডিগ্রির পাশাপাশি প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে ছোট ও মডুলার প্রশিক্ষণ কোর্সের ব্যবস্থা করা।
পরিশেষে বলব আসুন আমরা সবাই মিলে, অধিক জনসংখ্যা ও উন্নয়নের পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ক ম্যালথাসের নেগেটিভ থিউরি কে পাশ কাটিয়ে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর চুড়ান্ত পজিটিভ সীমানায় অবস্থান করে আগামীর বাংলাদেশ সুখী সমৃদ্ধ ও ন্যায় ইনসাফ, ক্ষুধা দারিদ্র্য মুক্ত উন্নত জীবন ও জীবনবোধের হোক।
লেখক: কৃষিবিদ ও বিশ্লেষক। একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত।