❒ শিক্ষাবোর্ডের মিটিংয়ে বোতাম খোলা শার্ট আর গলায় এয়ারফোন নিয়ে ছাত্রদল নেতা
বিশেষ প্রতিবেদক
শিক্ষা বোর্ড সচিবের অপসারণ চেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে আজ মিছিল হয় ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর শিক্ষা বোর্ডের নাম ও বয়স সংশোধন সংক্রান্ত এক অফিসিয়াল মিটিং। সেখানে উপস্থিত বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা, জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতা এবং বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষরা। এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে বুকের শার্টের বোতাম খোলা ও গলায় কানে শোনার এয়ারফোন ঝুলিয়ে প্রবেশ করেন এক শিক্ষার্থী, যিনি নিজেকে ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। ঘটনা দেখে একজন প্রবীণ শিক্ষক ও কর্মকর্তা হিসেবে তাকে শালীনতার পাঠ দিতে বাহু ধরে শাসন করেন শিক্ষা বোর্ডের সচিব। আর সেই সাধারণ ঘটনাকেই এখন "শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও থাপ্পড় মারার" অভিযোগ এনে সচিবের অপসারণ দাবিতে মাঠে নেমেছে ছাত্রদল।
ঘটনাটি ঘটেছে গত রোববার যশোর শিক্ষা বোর্ডে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোমবার দুপুরে যশোর সরকারি এম এম কলেজে বিক্ষোভ মিছিল ও পরে বোর্ডে স্মারকলিপি প্রদান করেছে ছাত্রদল।
অভিযোগকারী শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান সিজান এমএম কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী এবং শাখা ছাত্রদলের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক। সিজানের দাবি, সার্টিফিকেটে মা-বাবার নাম সংশোধনের কাজে তিনি সচিবের কক্ষে গেলে তাঁর গলায় হেডফোন দেখে সচিব ড. আব্দুল মতিন ক্ষিপ্ত হন এবং তাকে চারটা চড় মারেন। এই ঘটনার প্রতিবাদে জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান বাপ্পিসহ নেতাকর্মীরা সচিবের দ্রুত অপসারণ দাবি করেন।
তবে ঘটনার দিন সভায় উপস্থিত থাকা একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে একদম ভিন্ন তথ্য।
সভা সূত্রে জানা যায়, রোববার শিক্ষা বোর্ডের দোতলায় নাম সংশোধন সংক্রান্ত অতি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং চলছিল। এতে জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু (আইনজীবী প্রতিনিধি হিসেবে), সরকারি ও বেসরকারি কলেজের বেশ কয়েকজন অধ্যক্ষ এবং বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সিজান তাঁর আবেদন নিয়ে গেলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কম থাকা সত্ত্বেও সচিব ড. আব্দুল মতিন জমা দান সাপেক্ষে অনুমোদনের সুপারিশ লিখে দেন।
আবেদনপত্রের কাজ করার সময়ই সচিবের নজরে আসে সিজানের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বিরোধী পোশাক—শার্টের বোতাম খোলা এবং গলায় এয়ারফোন ঝুলানো। তখন সচিব তাঁর কনুইয়ের কাছে ধরে শিক্ষকসুলভ ভঙ্গিতে সতর্ক করে বলেন, "তুমি একজন শিক্ষার্থী, এটি একটি মিটিং—এভাবে কেউ আসে?"
মিটিংয়ে উপস্থিত বেসরকারি কলেজের একজন অধ্যক্ষ নাম প্রকাশ না করে জানান, "সেখানে মারামারির মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি। সচিব স্যার অত্যন্ত ভদ্র মানুষ। একজন দীর্ঘদিনের শিক্ষক যেভাবে স্নেহের দাবি নিয়ে ছাত্রকে শাসন করেন, তিনি সেটাই করেছেন। কিন্তু ছাত্রটি হয়তো সেটি সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি।"
একই সভায় থাকা জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবু জানান, সিজান একটু উত্তেজিত হলে পরিস্থিতি শান্ত করতে তিনি নিজেই তাকে কক্ষের বাইরে পাঠিয়ে দেন। তিনি বলেন, "মারামারির মতো কিছু হয়েছে বলে আমি মনে করি না। শিক্ষক হিসেবে হয়তো ওই ছাত্রের ভুলত্রুটি নিয়ে কথা বলেছেন।"
এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ড সচিব প্রফেসর ড. আব্দুল মতিন বলেন, "সে আমাদের সন্তানতুল্য। মিটিংয়ের মতো জায়গায় এমন পোশাক দেখে একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক হিসেবে শাসন ও স্নেহের অধিকার থেকে তাঁর বাহু ধরেছিলাম। সেখানে কোনো রাগ বা হিংসা ছিল না, ছিল অভিভাবকত্ব। এটাকে লাঞ্ছনা হিসেবে ট্যাগিং করা দুঃখজনক।"
শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. ফারুকে আযম মু. আব্দুস ছালাম জানান, "ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা বিএনপি সভাপতি এবং অন্যান্য অধ্যক্ষদের সাথে আমি কথা বলেছি। সবাই একবাক্যে নিশ্চিত করেছেন যে চড়-থাপ্পড় বা শারীরিক লাঞ্ছনার কোনো ঘটনা ঘটেনি। বেপরোয়া ভাব ও পোশাকের কারণে শিক্ষক হিসেবে সচিব তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন মাত্র। বিষয়টি নিয়ে একটি রাজনৈতিক ভুল বোঝাবুঝি তৈরির চেষ্টা চলছে, যা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।"
এরআগে আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় সরকারি এম এম কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে এ বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
মিছিলটি কলেজের ‘চেতনায় চিরঞ্জীব’ ভাস্কর্যের পাদদেশ থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিল শেষে সমাবেশে বক্তারা ঘটনাটিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় আখ্যা দিয়ে অভিযুক্ত সচিবের দ্রুত অপসারণসহ সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
এই দাবিতে সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন জেলা ও কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।