❒ সাক্ষাৎকার
সাবরিনা মমতাজ
যশোরের সীমান্ত ঘেঁষা বেনাপোলে ১৯৮৫ সালে জন্ম সাবরিনা মমতাজের। তার পিতা আব্দুর রাজ্জাক ও মা জাহানারা বেগম। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের মধ্যদিয়ে বেড়ে ওঠা সাবরিনা তার শিক্ষাজীবনে মেধার সুপ্ত স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। ব্যক্তিগত জীবনে সাবরিনা মমতাজ ও মাসুদ ইকবাল টিটো দম্পতির ঘর আলো করে রয়েছে তাদের একমাত্র পুত্রসন্তান আরাফাত ইকবাল কথন।
তিনি আরক্ত কবিতা, ছোট গল্প ও উপন্যাসে । এ পর্যন্ত যৌথভাবে তার ৫টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম তার প্রিয় কবি। পছন্দের তালিকার কিছু উপন্যাস- সমরেশ মজুমদারের 'কালবেলা', মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি', বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পথের পাঁচালী' ও গল্প রবি ঠাকুরের 'রবিবার'। একান্ত অবসরে ইতিহাস জানা ও পড়া, সিনেমা দেখা আর গান শোনায় অতিবাহিত করেন।
এই লেখককে আমরা লিখিতভাবে ২০ টি প্রশ্ন করেছিলাম। সেই আলোকে নেওয়া সাক্ষাৎকারটি । সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ধ্রুব নিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক-ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
প্রশ্ন: “খড়ের গম্বুজ” শব্দবন্ধটি শুনলে আপনার মনে প্রথম কীসের ছবি বা স্মৃতির উদ্রেক হয়?
সাবরিনা মমতাজ: "খড়ের গম্বুজ"শব্দটা পড়লেই আমার চোখে ভেসে ওঠে, আমার ছোট বেলা,ধানের শীষ বের করার পড় মূল্যহীন ভাবে গাদা দিয়ে রাখা গরুর খাবার, শীতের সকালে আগুনে নিজেকে উষ্ণ করার উপকার। যেটা গম্বুজের মত করে সংরক্ষণ করা হয়। খেলায় মেতে ওঠার সময় যেখানে ছোট বেলায় লুটোপুটি খেয়েছি, সেই আত্মার সাথে মিশে থাকা একটা ঘ্রাণ স্পষ্ট মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠে।
প্রশ্ন: এই তীব্রযান্ত্রিক ও নাগরিক সময়ে দাঁড়িয়ে নিজের শিকড় বা মাটির কাছাকাছি থাকাটা একজন লেখকের জন্য কতটা জরুরি?
সা. মমতাজ: সত্য স্বীকার করলে বলতে হবে, এখন যে যান্ত্রিক যুগ চলছে আমরা চাইলেও বেশি সময় নিজেকে প্রকৃতির কাছাকাছি রাখতে পারছি না। ভাষাও এখন আমাদের যান্ত্রিক হয়ে গেছে।এখন জরুরি হচ্ছে আমাদের এই রং করা আবরণটা মাঝে মাঝে খুলে, গ্রামের মাটির মুখোমুখি নিজেকে দাঁড় করিয়ে; শেকড়কে স্পর্শ করে দেখা। প্রযুক্তির ভাষাকে ভুলে নিজের ভাষায় লেখার জন্য মুক্ত সেই যে নানী বাড়ির এলোমেলো কথায় লেখার চেষ্টা করা।
এটা অত্যন্ত জরুরি একজন সফল লেখক হতে হলে নিজের শেকড় থেকে শুরু করতে হবে, যা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেটা অনুভব করতে আমরা যন্ত্রের সাহায্যে চেষ্টা করছি।

প্রকৃতির মাঝে একান্তে লেখক, ছবি: ধ্রুব নিউজ
প্রশ্ন: আপনার লেখায় গ্রামীণ জীবন, লোকজ উপাদান কীভাবে জায়গা করে নেয়? কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতা আছে কি?
সা. ম : আমি কবিতার থেকে বেশি চেষ্টা করি গল্পে গ্রাম তুলে ধরতে, কারণ প্রকৃতির রূপের রহস্য উদঘাটন করার মত, শক্তিশালী বোধগম্য সহজ ভাষা- প্রয়োগ করে গ্রামীণ জীবনের বর্ণনা দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন আমি আজও করতে পারিনি। মনে করি কবি জসিম উদ্দিনই এর সর্বোচ্চ প্রয়োগ করেছেন। তবে লেখার সময় যেসব উপকরণ আমাকে কাতর করে সেটা হচ্ছে,পায়ে ধান ভানা, মেঠোপথের পাশে তাল গাছের পদতলে নাম না জানা বুনো গাছের গন্ধে কৃষক লাঙ্গল কাঁধে কাস্তে হাতে দ্রুত বাড়ির পানে ছুটছে, একই রাস্তায় বৃষ্টি আসলে গরু ছাগল নিয়ে কন্যা, ছেলে, মা-খালা কাদায় তাদের তাড়িয়ে তাড়িয়ে ঘরে ফিরছে। নানীর বাড়ি আসছে নাতী পায়জামাটা হাঁটুর ওপর তুলে কাদায় মাড়িয়ে। এসব বলে শেষ করা যাবে না।
প্রশ্ন: আমরা কি ক্রমশ আমাদের ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যিক রূপগুলো হারিয়ে ফেলছি? সেই অভাব কীভাবে পূরণ করা যেতে পারে?
সা. ম : অবশ্যই, আমরা ক্রমশই ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যের রূপ হারিয়ে ফেলছি। আমি তখন খুব ছোট শুক্রবার বা শনিবার রেডিও তে রাত ১০টায় নাটক হতো। সেখানে অনেকবার একটা নাটক আমি শুনেছি সেটার নাম আজ আমার মনে নেই। বিষয়বস্তু এমন ছিল, কালবৈশাখী চলছে, লেখক তা দেখে লিখতে বের হলেন রাতের বেলা। তিনি একটা গাছের নিচে বসে বাতাসের নিঃশ্বাসও লিপিবদ্ধ করতে লাগলেন, বিন্দুতের আলো গুনতে লাগলেন, ঝড় ক্রমশই বাড়ছে সেদিকে তার খেয়াল নেই । লিখেই চলেছেন। একটা সময় যে গাছের নিচে বসে তিনি লিখতে বসেছিলেন সেই গাছটাই তার উপর ভেঙে পড়ল এবং তিনি সকাল অবধি বেঁচে ছিলেন।এই যে লেখার জন্য উপকরণের লোভ বোধ করি এটা এখন আর নেই।
এই সাহসী পদক্ষেপ কোন লেভেলের লেখক নিতে পারে? তখন পাঠকও ছিল, এখন সেই লেখা নাই, পাঠক নাই। এই অভাব পূরণ করতে হলে আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে অনুভূতি ও বাতাসের নিঃশ্বাস গুনতে জানতে হবে, তার জন্য বাতাসের কাছে যেতে হবে, বাতাসকে ঘরে আনা যাবে না।
প্রশ্ন: এমন কোনো বই বা সাহিত্যকর্মের কথা বলবেন, যা পড়ার পর আপনার মনে হয়েছে—এটি সরাসরি মাটির গন্ধ থেকে তৈরি?
সা. ম: অবশ্যই এমন অনেক বই, সাহিত্য আছে যা পড়ে আমি ঘরে দামী বেটসিটের পালঙ্কে শুয়েও অনুভব করেছি আমি কাদায মেখে একাকার, আমি নদীর ওপর ভাসমান, আমি ক্ষুধার, আমি গেছো দস্যি মেয়ে। চাপরাশি, পদ্মানদীর মাঝি, আসমানী কবিতা, নকসী কাঁথার মাঠ ইত্যাদি । আমি এসব পড়ি আর নিজেকে আবিষ্কার করি-একজন মোটামুটি ভাল পাঠক, লেখক ভাবার সাহস পাই কই! আমি টিফিনের টাকা জমিয়ে অনেক বই কিনেছি।এখন কেউ বই কেনেন ই না। শত শত লেখক, কিন্তু পাঠক প্রায় শূন্য।
প্রশ্ন: আপনার লেখার আদর্শ পরিবেশ কোনটি? লেখার সময় কোনো বিশেষ অভ্যাস বা অনুঘটক কি আপনাকে সাহায্য করে?
সা. ম: আমি যেখানে সেখানে লিখি, চলতি ট্রেনে,বাসে বসে, রান্না করতে করতে এক লাইন, বিছানায় শুয়ে, হঠাৎ পাখির ডাকে আপ্লুত হয়ে লিখি। তবে এসব যখন বসে বসে জুড়তে থাকি বা জোড়ার সময়টা আমার কাছে রাত সব থেকে ভালো মনে হয়। তখন কেউ আমার সাথে কথা বললে বিরক্ত লাগে। আমি সম্পর্ক ভুলে যাই। পরিস্থিতি ভুলে যাই। আমি শুধু লেখার নায়ক হয়ে উঠতে ভালোবাসি
প্রশ্ন: আপনার কোনো জনপ্রিয় লেখার পেছনের এমন কোনো অজানা গল্প আছে, যা পাঠক বা দর্শকরা আগে কখনো শোনেনি?
সা. ম: আমার কোনো জনপ্রিয় লেখা আছে কি না আমি জানি না। পাঠকদের মন্তব্য জানার মত সুযোগও পাই নাই।তবে কিছু লেখার প্রশংসা পেয়েছি। তার মধ্যে আছে আমার একটা ছোট গল্প যেটা বাস্তব জীবন থেকে নেওয়া। লেখাটি পুরষ্কার পেয়েছিল, পাঠকের কেমন লেগেছিল জানি না তবে আমি নিজেই কান্না করি আজও সে কথা মনে হলে।
প্রশ্ন: লেখার শুরুর মুহূর্তের যে মানসিক লড়াই বা প্রথম লাইনটি লেখার দ্বিধা , তা আপনি কীভাবে পার করেন?
সা. ম: আমি শুরুতেই কোনো দ্বিধাতে থাকি না বরং প্রথম লাইনে আমি খুব ই আত্মবিশ্বাসী থাকি। লেখার পরের লাইনগুলো আমাকে ভাবিয়ে তোলে এবং রীতিমতো বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায়। আমি পাঠকের পড়ার জন্য লিখি না। পাঠকের মনের মধ্যে একাকিত্ব বা আনন্দের অনুভূতি টেনে বের করতে লিখি।
প্রশ্ন: একটি লেখা শেষ হওয়ার পর আপনার অনুভূতি কেমন হয়? আপনি কি নিজের লেখা নিয়ে সহজে সন্তুষ্ট হতে পারেন?
সা. ম: এটা খুব সুন্দর প্রশ্ন,লেখা শেষ হলে আমি যেন জেল থেকে মুক্তি পেলাম। কিনারা পেল আমার পালহীন তরী। আমি আমার লেখা নিয়ে একটুও সন্তুষ্ট হতে পারি না। যতবার পড়ি, শুনি মনে হয় কোথাও একটা কিছু থাকতে পারত, কিন্তু আমি দিতে পারিনি।
প্রশ্ন: যদি আপনাকে আপনার নিজের যেকোনো একটি চরিত্র বা কবিতার লাইনের সাথে তুলনা করতে বলা হয়, আপনি কোনটি বেছে নেবেন এবং কেন?
সা. ম: যদি আমাকে একটি চরিত্র বেছে নিতে বলেন তাহলে আমি পথিক যার গন্তব্য আছে কিন্তু তবু সে যেতে চায় না।
কবিতার একটা লাইন-
'পালতোলা নৌকাও তীরে ভেড়ে,
শেওলাও কূল খুঁজে পায়।'
পার্থক্য হচ্ছে, নৌকার নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকে এবং তা ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
শেওলা কূল পেলে গন্তব্য খুঁজে নেয় এবং ডুবে যাবার ভয় থাকে না।"
এই লাইনগুলো। আমাকে হারিয়ে ফেলে আমার মাঝে।
নিজের দায়িত্ব নিজে নিলে অন্যের দ্বারস্থ হতে হয় না, নিজের বাঁচা মরার দায়িত্ব ও অন্যের হাতে যায় না।
প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া এবং রিলস/শর্ট ভিডিওর যুগে মানুষের পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে কি? সাহিত্যকের এর সাথে কীভাবে মানিয়ে নিতে হবে?
সা. ম: বর্তমান সময় অবশ্যই পাঠক কম, পড়তে গেলে কাজের ব্যাঘাত ঘটে সময় দিতে হয়। বর্তমান আমাদের সময় সংকট।পড়ার অভ্যাস নতুনদের মাঝে নেইই।আর আমরা সময় পাই না। তাই লেখা শোনানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যুগ পাল্টেছে, প্রতিটি কাজের ধরণ পরিবর্তন হয়েছে, সাহিত্যের সাথে পাঠক ধরে রাখার জন্য এখন যুগোপযোগী কৌশল অবলম্বন করতে হবে। আমরা হাজারবার চাইলেও এখন আর অতীতের মত পড়ায় মুখ দিয়ে পড়ে থাকা পাঠক পাব না, একটা বই শেষ হলে আমি মাইলের পর মাইল হেঁটে বন্ধুদের কাছ থেকে বই এনেছি ওই দিন আর আসবে না। সাহিত্য কে আধুনিক করে তোলার লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।

লেখক দোতলার ব্যলকনিতে, ছবি: ধ্রুব নিউজ
প্রশ্ন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর এই যুগে মানুষের আবেগের জায়গা থেকে মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টির ভবিষ্যৎ আপনি কেমন দেখছেন?
সা. ম: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI যুগে সাহিত্য বলতে গেলে সাহিত্য আছে কিন্তু তার মর্যাদায় ভাটা পড়েছে বেশ খানিকটা। আজ যতটুকু আছে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কবিতা কে কবিতায় ইতিহাস হিসেবে শুনবে।পড়ার অভ্যাস তারা করেনি। মিউজিয়ামে কবিতা বা উপন্যাসের বই দেখানো হবে। আমার মতে এটাই সাহিত্যের ইতিহাস। যে প্রজন্ম পরীক্ষার জন্য কবিতা মুখস্থ করে না তাদের কাছে এর থেকে বেশী কিছু আশা আমি করতে পারি না।
প্রশ্ন: সমকালীন তরুণ লেখকদের লেখার মধ্যে কোন শক্তি বা কোন সীমাবদ্ধতা আপনার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে?
সা. ম: আমরা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য লিখি। বেশ কিছু লেখকের লেখা পড়ে মনে হয় এরা কেন পাঠক হতে চায় না। আবার কিছু লেখকের লেখা পড়ে মনে হয় এদের হাতে হয় তো সাহিত্যের রাজ্যত্ব কায়েম হবে। তরুণ লেখকদের মধ্যে কিছু সংখ্যক দৃশ্য দেখতে দেখতে লেখে, কিছু সংখ্যক দৃশ্যের ভাব না বুঝেই লেখেন। তরুণদের মধ্যে লেখক হবার থেকে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা বেশি, অন্যের সৃষ্টি কে প্রতিযোগিতা হিসেবে নেয়; এটাই প্রধান সীমাবদ্ধতা।
প্রশ্ন: একটা ম্যাগাজিন বা পত্রিকার ছোট পরিসরে সাহিত্যচর্চা এবং একটি আস্ত বই লেখার মধ্যে একজন লেখকের মানসিকতায় কী তফাত থাকে?
সা. ম: ম্যাগাজিন একটা দেশ আর বই একটা বিশ্ব। লেখায় কোনো তফাৎ থাকে না। আমার মনে হয় কোনো লেখকই ম্যাগাজিন ও বই এই ধারনা নিয়ে লেখেন না। লেখক লেখার উপকরণ পান লেখেন সেটা ম্যাগাজিন বা বই এটা তার ভাবার বিষয় থাকে না।তার লেখা প্রতিটি সৃষ্টিই তার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।এই বেপারে আমার মানুষিকতায় কোনো তফাৎ আমি পাই না।
প্রশ্ন: বর্তমানের সাহিত্য সমালোচনা কি তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে? একজন লেখকের মূল্যায়নে পাঠকের ভূমিকা এখন কতখানি?
সা. ম: বর্তমান সাহিত্য সমালোচনা অবশ্যই তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। অনেক সময় আমি বুঝতে পারছি এটা কবিতাই না। কারণ আমি একজন ভাল লেখক না হলেও ভাল পাঠক। তারপর ও ব্যক্তিবিশেষে প্রশংসা না করলে তার অপ্রিয় হতে হয় পাছে এই ভয়ে। প্রতিযোগিতার কথা উঠলে , কী লিখলেন সেটা বড় কথা নয়, কে লিখলেন তার উপর ভিত্তি করে সম্মাননা দেওয়া হয়। অনেক লেখকের লেখা আমরা লেখকের মৃত্যুর পর পড়েছি এবং তাকে কালজয়ী করেছি। অতএব লেখার উদ্দেশ্য ই তো সবাইকে লেখকের উদ্দেশ্য জানানো।তাই লেখার মূল্যয়নে পাঠকের বিকল্প নেই।
প্রশ্ন: জীবনের শুরুর দিকের আপনার যে সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, সময়ের সাথে সাথে তাতে কী ধরণের বড় রূপান্তর বা পরিবর্তন এসেছে?
সা. ম: এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার নিজের উপর হাসি পায়। আমি যেহেতু ছোট থেকেই বই পড়তাম সেহেতু একি বই বড় হয়েও পড়েছি। এবং অনুভব করি আগে পড়ে আমি লেখার যে মানে বের করতাম সময়ের সাথে একি বই পড়ছি তার ভিন্ন মানে ভিন্ন অনুভূতি অনুভব করছি। ছোট বেলায় যে পড়া আমাকে আনন্দ দিত এখন এক ই লেখা আমাকে পিড়া দেয়।যেমন "সবদার ডাক্তার মাথা ভরা টাক তার...আহা রোগীর কি করুণ অবস্থা এখানে,,অথচ হেসে ই লুটোপুটি খেয়েছি কত, এই কবিতা পড়ে! আসলে সময়ের সাথে সাথে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়, সাহিত্যের রূপ বদলে যায়।
প্রশ্ন: একজন লেখকের কি সমাজ বা রাজনীতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকা উচিত, নাকি সাহিত্য কেবলই খাঁটি শিল্পের জন্য হওয়া উচিত?
সা. ম: লেখক, কবি, সাহিত্যিক সমাজের বাইরের কেউ নন। অতএব অবশ্যই সমাজ ও রাজনীতিতে তাদের অবদানের স্বীকৃতি থাকতে হবে, দায়বদ্ধতাও থাকা উচিৎ। এই স্বাক্ষর আমরা পেয়েছি নজরুল ইসলামের লেখায়, সমরেশ মজুমদার, সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ লেখকের লেখায়। খাঁটি শিল্প বলতে কী বুঝায় আমি জানি না ,তবে লেখকের প্রতিটি অবদান ই শিল্প, প্রতিটি লেখাই রয়েছে এক এক রকমের বার্তা যা কিনা সমাজ, সংস্কৃতি, সংসার ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অবদান রেখেছে যুগের পর যুগ।
প্রশ্ন: এমন কোনো লেখার স্বপ্ন কি আপনার আছে, যা আপনি এখনো লিখে উঠতে পারেননি কিন্তু একদিন লিখতে চান?
সা. ম: প্রতিটি লেখকেরই মনে হয় এমন একটা বিষয়ে লেখার সাধ থাকে যা লেখা হয়ে ওঠে না।তিনি নিজেই হয় তো শব্দের সাথে ছবির মিল খুঁজতে থাকেন এবং ভাবেন কোনো একটা সময় অবশ্যই আমি সফল হবো। আমার ও আছে তেমন অসম্পূর্ণ স্বপ্ন।
প্রশ্ন: আপনার জীবনের এমন কোনো ঘটনা বা ট্র্যাজেডি আছে, যা আপনার লেখার পুরো মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল?
সা. ম: হ্যা, আছে একটা নয়, আমি বেশ কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজের লেখার মোড় নিজের অজান্তেই ঘুরতে অনুভব করেছি।তার মধ্যে রয়েছে আমি আমার স্কুলের জন্য আন্দোলন গেলাম তখন।কত রকম মানুষের কত রকম গল্প, কতটা সময়,কত মায়া জালে জড়িয়ে জীবন এবং রাষ্ট্রের পক্ষে বিপক্ষে কত মন্তব্য। সরকারের দায়বদ্ধতা, সীমাবদ্ধতা ইত্যাদির সাথে পরিচয় হলো এবং লেখার আমল আমার পরিবর্তন হলো।এমন অনেক ঘটনাই লেখকের জীবন থাকে,সে ই কারণেই এক ই লেখক ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের, গন্ধের লেখা লিখতে পারেন।
প্রশ্ন: "খড়ের গম্বুজ"এর পাঠক এবং নতুন প্রজন্মের সাহিত্যিকদের উদ্দেশে কিছু বলুন।
সা. ম: আমি ও "খড়ের গম্বুজ" এর একজন পাঠক, কাচা- পক্ত অনেক লেখকই এখানে নিজেকে উজাড় করে লেখেন। যার যার জায়গায় প্রতিটি লেখক অসাধারণ সুন্দর লেখেন। নতুন আমি নিজেও। আমার লেখার হাত এখনো কাঁচা। আমরা যারা লেখায় এখন পরিপক্ক না-তাদের ভাবনা হতে হবে বৃষ্টির মত স্বচ্ছ, সাগরের মত নীল, যার পানে তাকিয়ে চোখ ভুলবে পথ। মন খুঁজবে গভীরতা, স্বপ্ন খুঁজবে পথ ও পালের নৌকা।
আরও পড়ুন-