সিদ্দিকা লাকী
জীবন গতিময়, নদীর মতোই বয়ে চলে। আমরা যাপিত জীবনে চলার পথে প্রায় সময়ে হতাশ হয়ে পড়ি,কখনো কখনো এ হতাশা দীর্ঘমেয়াদি ভয়ংকর রুপ ধারন করে থাকে।
ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক, চাকরি, সংসার, সম্পত্তি, সন্তান,এমন কি প্রিয় মানুষটিকে নিয়েও আমরা হতাশ হয়ে যাই সময়ের পরিক্রমায়। কিন্তু হতাশা জীবনকে শেষ করে দেয়, ধাবিত করে নতুন এক কালো অধ্যায়ের দিকে, এটা হতে পারে না। "জীবন সুন্দর।"
এই উপলব্ধিটুকু সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে হতাশা থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া যায়। আরও একটি কার্যকর উপায় হলো আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। আজকের লেখায় আমি আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায় নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।
আত্মবিশ্বাস কী
আত্মবিশ্বাস হলো নিজের প্রতি সর্বোত্তম বিশ্বাস,নিজের পারা আর না পারা গুলোর সঠিক বিশ্লেষনের একটি সূচক হলো আত্মবিশ্বাস।অর্থাৎ নিজের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতাগুলোকে একটি স্বাভাবিক মানসিক প্রক্রিয়া দিয়ে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলাই হলো আত্মবিশ্বাস। সহজ অর্থে, আত্মবিশ্বাস একটি মানসিক প্রক্রিয়া যা আপনার কর্ম তথা জীবনাচরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে।
আত্মবিশ্বাস বাড়াতে কী করবেন
১. ইতিবাচক মনোভাব চর্চা
আমরা জানি মনোভাব সাধারণত ২ প্রকার। ইতিবাচক ও নেতিবাচক।
আপনি ইতিবাচক মনোভাবের অধিকারী কিনা, তাও পরীক্ষা করে নিতে পারেন। এ বিষয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত লিখবো। যাই হোক,নিজের প্রতি ও ঘটে যাওয়া পারিপার্শ্বিকতার প্রতি সবসময়ই ইতিবাচক মনোভাব অটুট রাখেবেন, কখনোই কোন উদ্ভুত পরিস্থিতিতে নেতিবাচক বা বিশৃঙ্খল(ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষেত্রে) আচরণ প্রদর্শন করা যাবে না, "আল্লাহ যা করেন,মঙ্গলের জন্য করেন ", এটি ইতিবাচক মনোভাবের একটি খুবই কমন বহিঃপ্রকাশ। যে কোন পরিস্থিতিতে নিজের প্রতি ও অন্যের প্রতি ইতিবাচক মনোভঙ্গি আপনার আত্মবিশ্বাসকে তরান্বিত করবে।
২. নিজের দোষ গুণগুলোর আক্ষরিক বিশ্লেষণ
একজন স্বাভাবিক রক্ত মাংসের মানুষ হিসেবে ষড়রিপু আপনার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে,এটাই স্বাভাবিক। আপনি আপনার ভালো দিকগুলো নিয়ে একটি তালিকা করুন,অপরদিকে খারাপ দিক বা মন্দ বিষয়গুলো নিয়েও হিসাব করুন। দেখা যাবে,আপনি ভালো মন্দের হিসাব মিলাতে গিয়ে নিজেকে চমৎকার ভাবে আবিস্কার করেছেন। ধরুন,আপনার পরোপকারী মানসিকতা আছে।কাউকে কিছু দিতে পারলে অথবা কারো জন্য কিছু করতে পারলে আপনার সুখ অনুভুতি হয়।কিন্তু আপনার ব্যক্তিত্বে রাগ জিনিসটা প্রচন্ড মাত্রায় বিরাজ করে।আপনি ধীরে ধীরে রাগ কমানোর জন্য চেষ্টা করে যাবেন।একদিন দেখবেন আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে, এভাবে আপনার ভালো মন্দগুলোর একটি চেকলিস্ট তৈরি করে ব্যালেন্স করার চেষ্টা করুন।
৩. নিজের তুলনা নিজের সাথেই করুন
আপনারা জানেন,পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই প্রতিভাবান, কেউ কেউ হয়ে থাকে অসাধারণ। আপনি কারো সাথে নিজেকে তুলনা করবেন না। আহা! আরেটু যদি ফর্সা হতাম, আমার হাইট যদি ওর মতো আকর্ষণীয় হতো, আমার যদি অনেক সম্পদ থাকতো, পাশের জনের এত এত বন্ধু আছে,আমার কেন নেই, ভুলেও এসব বিষয় নিয়ে ভাববেন না, মনে রাখবেন,আপনি এ বিপুলা পৃথিবীতে অনন্য, আপনাকে সৃষ্টিকর্তা তাঁর সেরাটা দিয়েই তৈরি করেছে, এই একটি মাত্র অনুভুতি আপনাকে চরম মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।
আরও পড়ুন-
রিলাক্সেশন টেকনিক নিয়ে কিছু পরামর্শ
৪. নিজেকে সময় দিন
আপনি যাপিত জীবনে কমবেশি ব্যস্ততা নিয়েই চলাফেরা করছেন।কিন্তু এই শত ব্যস্ততার মধ্যেও আপনার নিজের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে,ঠিকমতো খাবার গ্রহণ,ব্যায়াম করা,বিনোদনে অংশগ্রহণ করা, সহকর্মীদের সাথে ভালো সময় কাটানো, পরিবারের সবার সাথে হাসিমুখে থাকা-
এসবের পাশাপাশি দিনে অন্তত আধা ঘন্টা সময় নিজেকে নিয়ে ভাবুন, সেই সময়টা শুধুমাত্র "আমার আমি" নিয়েই কাটিয়ে দিন। নিজেকে সময় দিলে আত্ম উপলব্ধি বাড়ে, আর আত্মউপলব্ধি আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে বহুগুন।
৪. লক্ষ্য স্থির করুন
জীবন তো একটাই, শুরু বা শেষ কি হবে আমরা কেউই জানি না,তাই একেবারে দীর্ঘমেয়াদি বা বড় লক্ষ্য নির্ধারন না করে ছোট ছোট লক্ষ্যগুলোকে উদ্দেশ্য করে সামনে এগিয়ে যাবে।
ধারাবাহিক সাফল্য আপনাকে অনেক দূরে নিয়ে যাবে,রাতারাতি সাফল্য নয়। মনে রাখতে হবে,লক্ষ্যগুলো যেমনই হোক,জীবন সাজাতে পরিকল্পনা বা লক্ষ্য নির্ধারনের কোন বিকল্প নেই।
৫. মানসিক চাপমুক্ত থাকুন
মানুষের জীবনে মানসিক চাপ থাকবেই।কিছু চাপ খুবই সাধারন ও স্থায়ী। যেমন- বিবাহিত জীবন, কর্মস্থলের চাপ বা পরিবেশ, বেতন বা আয় রোজগার, স্বাস্থ্য ইত্যাদি।
কিন্তু এগুলো তো স্বাভাবিক সব মানুষকেই ফেইস করতে হয়।আপনার দাম্পত্য বা কর্মজীবনের মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী ফ্যাক্টরগুলোকে চিহ্নিত করুন, সেই অনুযায়ী জীবন যাপন বা লাইফস্টাইল বদলে ফেলুন, এ ব্যাপারটা একদম ম্যাজিকের মতো কাজ করে। আর মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকতে পারলে আপনার ব্যক্তিত্বও সমৃদ্ধি হয় এবং আপনার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় বহুগুন।
৬. অন্যের জন্য ভাল কিছু করুন
যতটুকু সম্ভব আপনার আশে পাশে কারো জন্য ভাল কিছু করার সুযোগ থাকলে সেটা কাজে লাগান।সাধ্যমতো আর্থিক সাহায্য করা,সংগ দেয়া কিংবা কারও কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারলেও আপনি তাকে খুশি করতে পারেন। সব খুশিই অপার্থিব একটা আনন্দ এনে দেয়।কারো ভালো কিছুর কারন হতে পারলে আপনি আগের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারবেন।
৭. মাইন্ড ম্যাপিং করুন
আপনার যাপিত জীবনে এখন যা হচ্ছে বা আগামীকাল যা হবে,সে ব্যাপারে পর্যাপ্ত ও পরিকল্পিত মনোসংযোগ বা মাইন্ড ম্যাপিং করুন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,ধরুন আগামীকাল আপনার পরীক্ষা আছে। তাহলে যতটুকু প্রস্তুতি নিয়েছেন,ততটুকুই আবার এবং শেষবারের মতো আজকেই অনুশীলন বা রিভাইজ করে নিন, এতে ফলাফল খুবই ইতিবাচক হয়ে থাকে।
অথবা,আগামীকাল অফিসে বসের সাথে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে, তাহলে আপনি সেই বিষয়টি নিয়ে গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে অনুশীলন করুন, দেখবেন, বস কি বলতে পারে,সিচুয়েশন কি হতে পারে, সহকর্মীদের মনোভাব ইত্যাদি বিষয়গুলো আপনার কাছে খুবই রিদমিক হয়ে ধরা দেবে,যা আপনার ক্ষেত্রে ইতিপূর্বে কখনোই ঘটে নি।
পরিশেষে বলব- নিজেকে উপলব্ধি করুন, পরিস্থিতি পড়তে শিখুন।
লেখক: কবি, গদ্যকার ও মোটিভেশনাল স্পিকার। অতিরিক্ত ডিআইজি হিসাবে সিআইডিতে কর্মরত।