ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
দেশে ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ শিশু মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে। এ ছাড়া পথচারী হিসেবে ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে ২৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ শিশু নিহত হয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের মধ্যে ৩ হাজার ৫৪৭ জনের বয়স ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে। ২ হাজার ৮৮৪ জনের বয়স ৬ থেকে ১২ বছরের মধ্যে ও ১ হাজার ৫৩২ জনের বয়স শূন্য থেকে ৫ বছরের মধ্যে।
বিজ্ঞাপন
গ্রামীণ সড়কে বেশি শিশু নিহত
দুর্ঘটনায় শিশু নিহত হওয়া সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রামীণ সড়কে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৭১৩ শিশু নিহত হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৩৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। আঞ্চলিক সড়কে ২ হাজার ৮২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ সড়কগুলো বসতবাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে শিশুরা বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এসব সড়কে যানবাহন চলাচলে নিয়ম-নীতির যথাযথ অনুসরণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকির ঘাটতিও রয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে।
পথচারী শিশুদের বড় অংশের মৃত্যু তিন চাকার যানে
পথচারী হিসেবে নিহত ২ হাজার ৮১২ শিশুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ২৭১ জন বা ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ শিশু তিন চাকার যানবাহনের ধাক্কায় মারা গেছে। এ ক্ষেত্রে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, নসিমন ও ভটভটির মতো যানবাহন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের চাপা বা ধাক্কায় ১ হাজার ১২৬ শিশু এবং প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় ৩১৭ শিশু নিহত হয়েছে। বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ গেছে ৯৮ শিশুর।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে মৃত্যু ৩১ শতাংশের বেশি
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫১৩ শিশু নিহত হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলতে গিয়ে নিহত হয়েছে ৯৬২ শিশু।
বিজ্ঞাপন
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিকেলে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৬৩৪ শিশু নিহত হয়েছে। সকালে মারা গেছে ২ হাজার ১৬৮ শিশু এবং দুপুরে ১ হাজার ৮১৩ শিশু। এ ছাড়া রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশু নিহত হয়েছে।
শিশুদের সড়ক নিরাপত্তায় ছয় সুপারিশ
সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধির ছয়টি কারণ চিহ্নিত করে ছয়টি সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। কারণগুলো হলো:
বিজ্ঞাপন
· দেশের সড়ক ও সড়ক পরিবহন শিশুবান্ধব না হওয়া
· নিরাপদে সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে শিশুদের মধ্যে সচেতনতার অভাব
· পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদে সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে শিশুদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ না দেওয়া
· অদক্ষ ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালক কর্তৃক যানবাহন চালানো
· দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকট
· আহত শিশুদের চিকিৎসায় পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা।
সুপারিশগুলো হলো:
· সড়ক ও সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা শিশুদের জন্য নিরাপদ করা
· নিরাপদে সড়ক ব্যবহার বিষয়ে পরিবারে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সচেতন করা
· অদক্ষ ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালক কর্তৃক যানবাহন চালানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা
· জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার সুযোগ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা
· সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন করা
· ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ বাস্তবায়ন করা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক ও পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে শিশুরা উদ্বেগজনক হারে হতাহত হচ্ছে। প্রতিটি শিশুর মধ্যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।