আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ মেরুর বরফে মহাবিশ্বের গোপন বার্তা খুঁজে পাওয়ার অসামান্য কীর্তি গড়ে পদার্থবিজ্ঞানে বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ সম্মাননা নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে তাঁর ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা এবং মহাকাশের দূরবর্তী উৎস থেকে ভেসে আসা অতি-উচ্চশক্তির ‘নিউট্রিনো’ কণা আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই মর্যাদা দেওয়া হলো।
সুইডেনের স্টকহোমে অবস্থিত রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে।
পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম পরাবাস্তব ধারণা ছিল—অ্যান্টার্কটিকার মাইলে পর মাইল বিস্তৃত জমাট বরফকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহার করা। অদম্য দূরদৃষ্টির মাধ্যমে সেই ধারণাকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন ফ্রান্সিস হালজেন। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রথম প্রস্তাব করেন যে, দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ ও ভূতাত্ত্বিকভাবে স্থিতিশীল বরফের স্তরকে একটি বিশাল নিউট্রিনো শনাক্তকরণ কেন্দ্র হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব। সেই মৌলিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে অ্যান্টার্কটিকায় প্রায় এক ঘনকিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠে পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর গবেষণা কেন্দ্র—'আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি'।
নিউট্রিনোকে প্রায়ই পদার্থবিজ্ঞানের 'ভূতুড়ে কণা' বলা হয়। আমাদের মহাবিশ্ব জুড়ে অগণিত নিউট্রিনো প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়াচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি নিউট্রিনো আমাদের মানবদেহ ও পুরো পৃথিবী ভেদ করে চলে যায়, কিন্তু অন্য পদার্থের সঙ্গে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। অতি বিরল কিছু ক্ষেত্রে একটি নিউট্রিনো যখন কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন সামান্য এক আলোর ঝলক তৈরি হয়।
মহাজাগতিক অন্যান্য চার্জযুক্ত কণা মহাকাশের চৌম্বক ক্ষেত্রে দিক পরিবর্তন করে বা শক্তি হারায়, যার ফলে তাদের মূল উৎস শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু নিউট্রিনো সম্পূর্ণ সোজা পথে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ভ্রমণ করে। ফলে এরা সরাসরি তাদের উৎপত্তিস্তলের নিখুঁত তথ্য বহন করে—যা মহাবিশ্বের চরম ও শক্তিশালী উৎসগুলো উন্মোচনে অন্য যেকোনো মাধ্যমের চেয়ে বেশি কার্যকর।
মহাজাগতিক অতি-উচ্চশক্তির নিউট্রিনো অত্যন্ত বিরল হওয়ায় সেগুলোকে ধরতে বিপুল পরিমাণ বরফের প্রয়োজন ছিল। সেই লক্ষ্যেই ২০১১ সালে আইসকিউব অবজারভেটরির নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হয়। গভীরে বসানো হাজার হাজার সংবেদনশীল সেন্সরের সাহায্যে ২০১১ সালের পর থেকে বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের বহুদূর থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো সফলভাবে শনাক্ত করতে শুরু করেন, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
ফ্রান্সিস হালজেনের এই উদ্ভাবনী নেতৃত্ব ও আইসকিউবের সংগৃহীত তথ্য আজ মহাবিশ্বের শক্তিশালী প্রাকৃতিক কণা ত্বরণকারী ও চরম মহাজাগতিক পরিবেশ বোঝার দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছে।