এম জামান
দিগন্তজোড়া সবুজ প্রান্তর, সুবিন্যস্ত সারিবদ্ধ বেড আর কচি পাতার সমারোহ। ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোরের কৃষি অর্থনীতিতে নীরব এক বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে একটি মাত্র গ্রাম। সাধারণ ফসল বা শীতকালীন সবজি চাষের প্রথা ভেঙে কেবল চারার বাণিজ্যিক উৎপাদনেই বাজিমাত করেছেন স্থানীয় কৃষকেরা। সদর উপজেলার চুড়ামনকাঠি ইউনিয়নের আব্দুলপুর গ্রামের এক মাঠ থেকেই মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে বিকোচ্ছে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার সবজির চারা। এক বিঘা জমি থেকেই যেখানে আয় হচ্ছে লাখ লাখ টাকা, সেখানে এই ‘চারা বিপ্লব’ এখন পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
দিগন্তজোড়া সবুজ প্রান্তর, সুবিন্যস্ত সারিবদ্ধ বেড আর কচি পাতার সমারোহ—দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে কোনো বিস্তীর্ণ উদ্যান। কিন্তু এটি কেবল কোনো সৌন্দর্য প্রদর্শনী নয়; যশোরের আব্দুলপুর গ্রামের মাঠে এটি লাখো কৃষকের স্বপ্ন ও কোটি কোটি টাকার ব্যবসার ক্ষেত্র। সবজি চাষের চেয়ে চারা তৈরিতেই বেশি লাভ—এই মন্ত্রকে সম্বল করে গ্রামটির প্রায় আশি জন কৃষক গড়ে তুলেছেন এক সুবিশাল ‘সবজি চারা হাব’।
আব্দুলপুর গ্রামের মাঠে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশের জমিতে ছোট ছোট সুবিন্যস্ত বেড তৈরি করা হয়েছে। কোথাও সদ্য বুনে দেওয়া বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গম হচ্ছে, কোথাও কচিপাতা মেলে ধরছে ছোট্ট চারা, আবার কোথাও বিক্রির উপযোগী চারা তোলা ও প্যাকেটজাত করার তোড়জোড় চলছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পুরো মাঠটি যেন একটানা বিছিয়ে রাখা কোনো বিশাল সবজি নার্সারি।
কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ বিঘা জমি জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এই চারা উৎপাদনের কাজ। গ্রামের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন কৃষক সরাসরি এই পেশায় সম্পৃক্ত। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুরুতে জমি প্রস্তুত করে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তৈরি করা হয় বীজতলা। সেখানে ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, মরিচ, টমেটোসহ অন্তত ২০ থেকে ২৫ ধরনের সবজির বীজ বপন করা হয়। অঙ্কুরোদগমের পর সঠিক পরিচর্যা, আগাছা দমন ও পানি সেচের মাধ্যমে প্রায় এক মাসের মধ্যে চারা বিক্রির উপযুক্ত হয়।
আব্দুলপুরের চাষিদের সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে জমি ব্যবহারের কৌশলগত দক্ষতার কারণে। একই জমিতে ছয় থেকে সাত মাসের মৌসুমে ৩ থেকে ৪ দফায় চারা উৎপাদন করা যায়। এক দফার চারা তুলে বিক্রি শেষ হওয়ার পরপরই জমি পুনরায় তৈরি করে আবার বীজ বোনা হয়। এতে কম জমি ব্যবহার করেই বিপুল পরিমাণ চারা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
কৃষকদের হিসেব মতে, এ মাঠ থেকে মৌসুমে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার চারা বেচাকেনা হয়। অন্যদিকে কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চুড়ামনকাঠি মাঠের প্রায় সাড়ে সাত হেক্টর জমিতে উৎপন্ন চারা থেকে অন্ততঃ ৮ কোটি টাকার লেনদেন ঘটে।
আব্দুলপুরে বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদনের এই প্রক্রিয়া হঠাৎ করেই গড়ে ওঠেনি; এর পেছনে রয়েছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় রোগমুক্ত ও গুণগত মানসম্পন্ন চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে আব্দুলপুর গ্রাম এখন এক বিশ্বস্ত নাম।
স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর এখানকার চারা ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে পৌঁছে যাচ্ছে পাশের জেলা চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা এবং উত্তরের বগুড়াসহ দেশের ১০ থেকে ১৫টি জেলায়। এমনকি অফলাইন বাজার ছাপিয়ে এখন অনলাইনের মাধ্যমেও বিভিন্ন প্রান্তের চাষিরা এখানকার চারার বুকিং দিচ্ছেন।
দূরদূরান্ত থেকে চারা কিনতে আসা কৃষক আশরাফুল ইসলাম জানান, “আগে নিজে চারা তৈরি করে চাষ করতাম, তাতে অনেক সময় ও ঝুঁকি থাকত। গত আট বছর ধরে আমি আব্দুলপুর থেকে চারা কিনে নিয়ে গিয়ে জমিতে লাগাচ্ছি। এখানকার চারার মান ও জাত দুটোই ভালো হওয়ায় ফলন নিয়ে চিন্তা করতে হয় না।”
যদিও চলতি বছর আবহাওয়াগত কারণে চারার দাম বিগত বছরের তুলনায় কিছুটা কম, তবুও চাষিদের বেচাকেনা থেমে নেই। বর্তমানে মানভেদে প্রতি হাজার ফুলকপির চারা ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা এবং বাঁধাকপির চারা ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া টমেটো ও বেগুনের চারা জাত এবং আকারভেদে প্রতি হাজার ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত বেচাকেনা হচ্ছে।
সাধারণ ফসলের তুলনায় চারা উৎপাদনে লভ্যাংশ অনেক বেশি হওয়ায় আব্দুলপুরের বেশিরভাগ কৃষকই এখন ধান বা অন্যান্য প্রথাগত ফসল ছেড়ে মৌসুমি চারা উৎপাদনে ঝুঁকেছেন। শুধু চারা উৎপাদনকারীই নন, চারা উত্তোলন, পরিচর্যা, পরিবহন ও বিপণনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বহু পরিবারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এত সম্ভাবনার মধ্যেও এই খাতটি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রার তারতম্য এবং বিভিন্ন ছত্রাকজনিত রোগবালাইয়ের কারণে অনেক সময় পুরো বীজতলার চারা নষ্ট হয়ে যায়। আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারণে চারা পচে গেলে বা দাম কমে গেলে ক্ষতির মুখে পড়তে হয় কৃষকদের।
যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, “আব্দুলপুর গ্রামে নিবন্ধিত ও সক্রিয়ভাবে চারা উৎপাদন করছেন ৬৪ জন চাষি। এখানে প্রতি ৩৩ শতাংশ (এক বিঘা) জমিতে গড়ে ১২০টির মতো বীজতলা বা বেড তৈরি করা যায়, যেখানে প্রতি বেডে প্রায় চার হাজার চারা উৎপন্ন হয়। প্রতি চারার গড় মূল্য যদি দেড় থেকে দুই টাকাও ধরা হয়, তবে মাত্র ৩৩ শতাংশ জমি থেকেই একজন কৃষক মৌসুমে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।”
তিনি আরও জানান, “কৃষি বিভাগের হিসাবে সাড়ে সাত হেক্টর জমিতে ৬ মাসের ব্যবধানে কৃষকেরা অন্তত ৮ কোটি টাকার চারা উৎপাদন করছেন। একই বেডে মৌসুমে ৩ থেকে ৪ বার চাষ হওয়ায় উৎপাদনের হার বহুগুণ বেড়ে যায়। এখানে বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো ও বেগুনের মতো মানসম্মত ও রোগমুক্ত জাতের চারা পাওয়া যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আব্দুলপুরের চারার প্রচুর সমাদর রয়েছে।”