Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

এখনো কাদার নিচে হারানো সোনা খুঁজে ফেরেন ইস্রাফিল

ধ্রুব ফিচার ধ্রুব ফিচার
প্রকাশ : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
এখনো কাদার নিচে হারানো সোনা খুঁজে ফেরেন ইস্রাফিল

ছবি: সংগৃহীত

গোসল করতে গিয়ে বা ভুলবশত পুকুরের পানিতে গলার হার, কানের দুল কিংবা নাকের ফুলটি পড়ে গেলে অনেকেই আশা ছেড়ে দেন। পুকুরের তলাজুড়ে যেখানে শুধুই ঘোলা পানি আর থিকথিকে কাদা, সেখানে খালি চোখে কিছু খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। চারপাশের স্বজনদের আকুলতা আর নারীদের কান্নাকাটিতে ঘাটে তখন বিষাদের ছায়া নেমে আসে।

ঠিক এমন হতাশাজনক মুহূর্তে মুশকিল আসান হয়ে আসেন একজন মানুষ। কাঁধে লম্বা বাঁশের তৈরি লোহার আঁচড়া আর হাতে অদ্ভুত এক ত্রিকোণাকৃতির ঝুড়ি নিয়ে হাজির হন তিনি। পানিতে নেমে কাদার নিচে হাতড়ে, কাদা ছেঁকে অবশেষে ঠিকই খুঁজে বের করেন হারিয়ে যাওয়া সোনা-রুপার অলংকার।

এই অদ্ভুত ও চমকপ্রদ দক্ষতার অধিকারী মানুষটির নাম ইস্রাফিল সরদার। বয়স ৫৪ বছর। থাকেন বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার কাটাখালী এলাকার একটি বেদে বহরে। ওই বহরের ১৬ ঘর পরিবারের সর্দারও তিনি। স্থানীয় মানুষ তাকে চেনে ‘পুকুর ঝাড়ানি’ নামে, তবে কাজের কেতাবি পরিচয়—তিনি একজন ‘স্বর্ণডুবুরি’। জীবনের দীর্ঘ ৩৩টি বছর ধরে পুকুর, ডোবা ও নানা জলাশয়ের অন্ধকার তলদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া অলংকার উদ্ধার করে মানুষের মুখের হাসি ফিরিয়ে আনছেন তিনি।

বংশানুক্রমিক বিদ্যা ও সোনা খোঁজার অদ্ভুত কৌশল

ইস্রাফিল শান্দার বেদে সম্প্রদায়ের ‘কুড়িন্দা’ উপগোত্রের সন্তান। এই উপগোত্রের মানুষেরা যুগ যুগ ধরে পানি থেকে সোনা-রুপা উদ্ধার করার কাজে পারদর্শী। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এই বিদ্যায় কোনো আধুনিক প্রযুক্তি বা পাওয়ার চশমা নেই; আছে শুধু অভিজ্ঞতা আর অনুমানের প্রখর ক্ষমতা।

পুকুরের তলা থেকে সোনা খুঁজে আনার পদ্ধতিটিও বেশ চমৎকার। ইস্রাফিলের কাছে থাকে একটি লম্বা বাঁশের হাতলযুক্ত লোহার আঁকড়া বা আঁচড়া। প্রথমে গহনা পড়ার সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করে সেই আঁচড়া দিয়ে পুকুরের তলার কাদা টেনে নিজের কাছে আনেন। এরপর বাঁশ ও প্লাস্টিক দিয়ে হাতে তৈরি ‘ঝাঁই’ নামের এক বিশেষ ঝুড়িতে সেই কাদা তোলেন। কাদাভর্তি ঝাঁইটি পানিতে রেখে বারবার ঝাঁকাতে থাকেন। পানির স্রোতে কাদা ধুয়ে বের হয়ে গেলে একসময় ঝুড়ির তলায় চকচক করে ওঠে কাঙ্ক্ষিত সোনার ঝিলিক।

তবে ইস্রাফিল জানান, এই কাজটি নিখাদ কৌশলের হলেও এতে ভাগ্যের ছোঁয়াও লাগে প্রচুর। তিনি বলেন, "পানিতে গহনা নিশ্চিতভাবে হারিয়েছে জানা থাকলে তা খুঁজে বের করা সম্ভব। কিন্তু গহনাটা কোথায় পড়েছে তার জায়গা যদি ঠিক না থাকে, তবে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কখনো কখনো অল্প কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঝাঁইয়ের ভেতর সোনা চকচক করে ওঠে, আবার কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাদা ঘেঁটেও কিছুই মেলে না। কাজটা আসলে অনেকটা লটারির মতো।"

অনিশ্চিত আয়ের পথ ও যাযাবর জীবন

পুকুরের তলা থেকে অলংকার উদ্ধার করতে পারলে মেলে ভালো অঙ্কের বকশিস বা পারিশ্রমিক। কিন্তু কিছু না পাওয়া গেলে জোটে শুধু হাড়ভাঙা খাটুনির পর সামান্য শ্রমমূল্য। এই অনিশ্চিত আয় দিয়ে পরিবার চালানো অসম্ভব। তাই সোনা খোঁজার ডাক না থাকলে বসে থাকেন না ইস্রাফিল। গ্রামে গ্রামে ঘুরে মালা, কড়ি ও মাদুলি বিক্রি করেন। কখনো কখনো বিষধর সাপ ধরার ডাক পড়লেও ছুটে যান।

ইস্রাফিলের স্থায়ী ভিটা মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার খড়িয়া গ্রামে। কিন্তু জীবিকার তাড়নায় সারা বছর তাদের যাযাবর জীবন কাটাতে হয়। বাগেরহাট, মোংলা, পিরোজপুর ও বরিশালের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো ছিল তাদের নিয়মিত বিষয়। তবে গত ১৮ বছর ধরে তিনি ফকিরহাটের কাটাখালী মহাসড়কের পাশের সরকারি জায়গায় ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছেন।

বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্য ও শেষ জহুরি

একসময় গ্রামবাংলায় এই পেশার বেশ খাতির ছিল। কিন্তু এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। তার চেয়ে বড় কথা, আগের মতো পুকুর, খাল বা ডোবা আর নেই—অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পানির নিচে অলংকার খোঁজার এই কাজের চাহিদা এখন নামমাত্র। মাসের পর মাস পার হয়ে যায়, কিন্তু ইস্রাফিলদের কোনো ডাক পড়ে না।

পেটের তাগিদে ও কাজ না থাকায় এই উপগোত্রের প্রায় সবাই এখন পেশা বদলে ফেলেছেন। বেদে বহরের প্রবীণ সদস্য ফজল আলী যেমন দশ বছর আগেই আঁকড়া আর ঝাঁই তুলে রেখে অন্য কাজে ভিড়েছেন।

বর্তমানে পুরো বেদে বহরে ইস্রাফিলই টিকে আছেন একমাত্র এবং শেষ ‘স্বর্ণডুবুরি’ হিসেবে। কোনো বড় আর্থিক লাভ না থাকলেও স্রেফ বাপ-দাদার স্মৃতি আর অনুভূতির টানেই তিনি এই পেশাকে এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন। তবে দিন দিন যেভাবে জলাশয় বিলুপ্ত হচ্ছে, তাতে হয়তো খুব শিগগির গ্রামবাংলার মেঠোপথে কাঁধে আঁচড়া নিয়ে ‘সোনা খুঁজি, রুপা খুঁজি’ বলে হাঁক দেওয়া এই অনন্য মানুষের দেখা আর মিলবে না।

 

 
 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)