আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হরমুজ প্রণালী ছবি: ধ্রুব নিউজ
চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে ছোটখাটো মতভেদ থাকলেও তেহরান যা চেয়েছিল, তার বড় অংশই প্রস্তাবে রয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প শুধুমাত্র হরমুজ আবার খোলার নিশ্চয়তা ছাড়া তেমন কিছুই অর্জন করতে পারছেন না।
শুক্রবার আমেরিকা ও ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, যুদ্ধের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তির খসড়ায় দুই পক্ষই একমত হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রাথমিক চুক্তিতে সই করার ব্যাপারে আশাবাদী ওয়াশিংটন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, চুক্তিতে এখনও পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। তবে এই সম্ভাব্য চুক্তি বুঝিয়ে দিচ্ছে, সংঘাতের পর তার দেশ আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই যুদ্ধে ইরানই বিজয়ী।'
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সমঝোতা স্মারকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে লিখিত বিবৃতিও থাকবে, যেখানে বলা হবে যে তারা 'ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল'।
তিনি আরও বলেন, আমেরিকা যদি ফের যুদ্ধের পথ বেছে নেয়, তবে ইরানও পাল্টা আঘাত হানতে প্রস্তুত। 'এই সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো যদি অক্ষরে অক্ষরে মানা না হয়, তবে চূড়ান্ত চুক্তিতে কোনোভাবেই স্বাক্ষর করা হবে না,' বলেন তিনি।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষের সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের শর্তও আছে। এরপর শুরু হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা। এই ইস্যুকেই যুদ্ধ শুরুর মূল কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, এ চুক্তি ট্রাম্পের মূল লক্ষ্যগুলো পূরণের পাশাপাশি চলমান আলোচনাকে 'খুব, খুব ভালো অবস্থানে' নিয়ে গেছে।
পশ্চিমা, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র থেকে পাওয়া চুক্তির খসড়ায় এমন কিছু শর্তের ইঙ্গিত মিলেছে, যা মূলত ইরানেরই পাল্লা ভারী করে। এর ফলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। যদিও তিনি এই প্রতিবেদনগুলোকে'ভুল বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে ছোটখাটো মতভেদ থাকলেও তেহরান যা চেয়েছিল, তার বড় অংশই প্রস্তাবে রয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প শুধুমাত্র হরমুজ আবার খোলার নিশ্চয়তা ছাড়া তেমন কিছুই অর্জন করতে পারেননি। ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলার পর প্রণালিটি বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান।
আরাগচি জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচলের নিয়ন্ত্রণ ওমানের পাশাপাশি ইরানের হাতেই থাকবে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালি পরিবাহিত হতো। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালীর অবস্থান ইরান ও ওমানের ঠিক মাঝখানে।
তিনি বলেন, 'হরমুজ প্রণালির ওপর সবসময় আমাদের তলোয়ার ঝুলবে।'
শুক্রবার সন্ধ্যায় আরাগচি জানান, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সে বিষয়ে 'খুব শিগগিরই' বিবৃতি আসতে চলেছে। আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি-র প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিবৃতিটি ওমান সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশ করা হবে।
শনিবার ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, প্রণালি-সংলগ্ন ইরানের সিরিক বন্দর ও কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মকর্তারা বলেন, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর অনুমতি ছাড়া যেসব নৌযান জলপথটি পার হওয়ার চেষ্টা করছিল, তাদের সতর্ক করতে ইরানি বাহিনী গুলি ছুড়েছে।
চুক্তিতে কী আছে?
একাধিক সূত্র রয়টার্সকে চুক্তির খসড়া শর্ত সম্পর্কে জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, হরমুজ খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় করতে শুরু করবে আমেরিকা। একইসঙ্গে দেশটির তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করা হবে।
৬০ দিনের আলোচনায় মূলত জায়গা পাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এ চুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পূর্ণ বিলোপ। তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করা হবে। দীর্ঘমেয়াদে ইরান শর্ত মানছে কি না, তা নিশ্চিত করতে থাকবে নজরদারি ব্যবস্থা।
কিন্তু আরাগচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, তেহরান আসলে ওই ইউরেনিয়াম তরল বা মিশ্রিত আকারে নিজেদের কাছেই রেখে দিতে চায়। 'উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে তেহরানের একমাত্র পছন্দনীয় সমাধান হলো এর ঘনত্ব কমিয়ে ফেলা,' বলেন তিনি। একাধিক সূত্রও জানিয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি হয়নি ইরান।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, খসড়া প্রস্তাবে তেহরানের জন্য সম্ভাব্য যুদ্ধজনিত ক্ষতিপূরণ ও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর থেকে মার্কিন বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার মতো পুরনো বিষয়গুলোও আছে। মার্কিন কর্মকর্তা অবশ্য এ দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, 'শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত ওদের কোনো অর্থ ছাড় করা হবে না। হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে হবে। কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে ইরান অর্থায়ন করতে পারবে না। ওরা এই শর্তগুলোতে সম্মতি দিয়েছে। এটা পারফরম্যান্স-ভিত্তিক চুক্তি।'
সমঝোতা স্মারকে নেই ইসরায়েল
একটি পশ্চিমা সূত্র জানিয়েছে, রোববারই সই হতে পারে এই চুক্তি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এতে সই করতে পারেন। সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে জেনেভা।
তবে আরাগচি বলেছেন, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই চুক্তিটি দূর থেকে (রিমোটলি) সই হয়ে যাবে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তা বলেন, চুক্তি সইয়ের ভেন্যু হিসেবে ইউরোপের কথা ভাবা হলেও এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ শুরু করলেও এই শান্তি আলোচনায় জায়গা পায়নি ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তার দেশ এই চুক্তিতে কোনো পক্ষ হবে না।
তেহরানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করতে লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান কমাতে ইসরায়েলকে চাপ দিচ্ছিলেন ট্রাম্প। এ নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর কয়েকবার বাদানুবাদ হয়েছে।
আরাগচি বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে লেবানন যুদ্ধের অবসান ঘটবে। যার প্রচ্ছন্ন অর্থ হলো, দখলকৃত এলাকাগুলো থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার।
তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, তারা সেনা প্রত্যাহার করবেন না।