ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: এআই প্রণীত
নতুন বছরের বাজেটে প্রস্তাবিত বেশিরভাগ পদক্ষেপ ব্যবসা ও করদাতা-বান্ধব হিসেবে প্রশংসিত হলেও, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন কিছু বিধান ব্যবসায়ের ওপর কর পরিপালনের বোঝা বাড়িয়ে দিতে পারে এবং চূড়ান্ত বিচারে সাধারণ ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনতে নতুন বাজেটে যুক্ত হচ্ছে এক অভিনব অগ্রিম কর আদায় পদ্ধতি।
প্রস্তাবিত এই অগ্রিম কর আদায় পদ্ধতির আওতায়, খুচরা বিক্রেতারা প্রতি ১,০০০ টাকার পণ্য কিনলে ডিলাররা তাদের কাছ থেকে ২ টাকা হারে অগ্রিম কর সংগ্রহ করবেন। এই ব্যবস্থার অধীনে একজন খুচরা বিক্রেতার বার্ষিক আয়ের একটি অংশ মূলত অগ্রিম হিসেবে কেটে নেওয়া হবে। অর্থবছর শেষে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় খুচরা বিক্রেতারা এই অর্থ তাদের প্রদেয় আয়করের সাথে সমন্বয় করতে পারবেন এবং করযোগ্য আয় না থাকলে তা ফেরত পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নীতি যেভাবে ভাবা হয়েছে সেভাবে কাজ নাও করতে পারে। তারা উল্লেখ করেন, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষুদ্র খুচরা বিক্রেতারই টিআইএন (TIN) নেই। ফলে তাদের কর রিটার্ন দাখিল করার কিংবা অগ্রিম কাটা করের টাকা সমন্বয় বা ফেরতের জন্য আবেদন করার প্রক্রিয়াতে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এর বদলে, তারা এই অতিরিক্ত খরচটি সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন।
উদাহরণস্বরূপ, একজন খুচরা বিক্রেতা যদি ডিলারের কাছ থেকে ৫,০০০ টাকার পণ্য কেনেন, তবে প্রস্তাবিত হারে ডিলার তার কাছ থেকে ১০ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখবেন। পণ্যের প্রকৃত মূল্য ৫,০০০ টাকা থাকলেও, খুচরা বিক্রেতা এটিকে ৫,০১০ টাকা ক্রয়মূল্য হিসেবে গণ্য করতে পারেন এবং এই বাড়তি খরচটি চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্যের সাথে যোগ করে দিতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো ব্যবসা যদি বছরজুড়ে ১,০০০ টাকা অগ্রিম কর দেয়, তবে সেই টাকা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেট থেকেই চড়া দামে উসুল করা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন, "যদি ডিলার পর্যায়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কর আদায় করা হয়, তবে তারা স্রেফ এই অর্থটিকে তাদের ক্রয় খরচের সাথে যোগ করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবেন। সরকার যদিও এটি ব্যবসার আয়ের ওপর আরোপ করতে চাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে এর পুরো দায় গিয়ে পড়বে ভোক্তার ঘাড়ে।"
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, "এই পদ্ধতিতে কর আদায় করা হলে ব্যবসায়িক জটিলতা এবং দুর্নীতি— উভয়ই বাড়তে পারে। এই টাকা সরকারি কোষাগারে যাওয়ার চেয়ে কিছু কর্মকর্তার পকেটে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে বাজেটের চূড়ান্ত প্রস্তাবনা দেখার পর আমরা আরও বিস্তারিত মন্তব্য করতে পারব।"
ভোক্তা অধিকার কর্মীরাও সাধারণ পরিবারের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চেয়ারম্যান এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে করই আদায় করা হোক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরেই গিয়ে বর্তায়। এমনকি, সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পাবে, ব্যবসায়ীরা ভোক্তার কাছ থেকে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা উসুল করে নিতে পারে। অবশ্য তিনি এটিও উল্লেখ করেন যে, কারওয়ান বাজারের একজন ডিম বিক্রেতাও দিনে ১০,০০০ টাকা আয় করতে পারেন, তাই করের পরিধি বাড়ানোর এই সরকারি চেষ্টা যৌক্তিক হলেও ব্যবসায়ীরা দিনশেষে এই খরচগুলো ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দেবেন।
তথ্যসূত্র : টিবিএস