অরুণ মজুমদার
বাংলা কাব্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক বিস্ময়। তাঁর কাব্য মানব জীবনকে যেমন করেছে সমৃদ্ধ, তেমন সঙ্কটে যুগিয়েছে আশা জাগানিয়া শক্তি। বহমান জীবন শুধু চক্রাকার বৃত্তে আবদ্ধ নয়, এ জীবন কখনও বাঁক বদল করে আবার কখন সরল রেখায় চলতে থাকে কোনো এক অজানা জগতে, আবার রূপান্তরিত হয়ে গ্রহণ করে নবতর দর্শনের স্বাদ! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের কাব্যাদর্শে যেমন রূপান্তরিত হয়েছেন, একই ভাবে বারবার মানুষকে করেছেন আশাপূর্ণ এবং দুঃসময়ে যুগিয়েছেন হাল ধরে রাখার সুদৃঢ় মানসিকতা।
মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান।
মেঘবরণ তুঝ, মেঘজটাজূট,
রক্তকমলকর, রক্ত-অধরপুট,
তাপবিমোচন করুণ কোর তব
মৃত্যু-অমৃত করে দান॥ (মরণ)
আমারে না যেন করি প্রচার
আমার আপন কাজে ;
তোমারি ইচ্ছা করো হে পূর্ণ
আমার জীবন-মাঝে। (গীতাঞ্জলি)
কবিতা দুটির মাধ্যমে কবি নিজেকে সমর্পণ করেছেন তাঁর স্রষ্টার কাছে। নিজের অসহায়ত্বকে প্রকাশ করেছেন, যার মাধ্যমে আমরা পরিষ্কার একজন ভাববাদী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পেয়েছি! এর পর থেকে তিনি নিজেকে ভেঙেছেন, রূপান্তরিত করেছেন ধীরে ধীরে ছুটেছেন বস্তুতন্ত্রের দিকে। তিনি লিখলেন -
আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে
হে সুন্দরী?
বলো কোন্ পার ভিড়িবে তোমার
সোনার তরী।
যখনি শুধাই, ওগো বিদেশিনী,
তুমি হাস শুধু, মধুরহাসিনী--
বুঝিতে না পারি, কী জানি কী আছে
তোমার মনে। (নিরুদ্দেশ যাত্রা)
কবির এই চলমানতা শেষ হলো যখন তিনি মনে করলেন তিনি তাঁর উদ্দীষ্টকে পেয়েছেন। তখন তিনি আবার লিখলেন এবং জানতে চাইলেন -
আপনি বরিয়া লয়েছিলে মোরে
না জানি কিসের আশে।
লেগেছে কি ভালো, হে জীবননাথ,
আমার রজনী আমার প্রভাত
আমার নর্ম্ম আমার কর্ম্ম
তোমার বিজন বাসে। (জীবন দেবতা)
রবীন্দ্রদর্শনের এই বিনয় বোধ আমাদের শুধু কাব্যিক করে না আমাদের জীবনাচারে নিয়ে আসে এক নবতর জাগরণ। স্রষ্টার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেকে ছুঁড়ে দিলেন বৈশ্বিক দর্শনের কোলে। তিনি এবার প্রবেশ করছেন বস্তুতান্ত্রিকতার দিকে। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন ব্যক্তিবোধ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ মানুষের মধ্যে আছে বলেই সে অন্যদের থেকে ভিন্ন এবং আমার জ্ঞান আছে বলেই আমি বুঝি পৃথিবীর রং, তার অনুভব! যেখানে আছে যুক্তির আবহ এবং নিজের বোধের উন্মেষে মনুষ্যত্বের বিকাশ। সেজন্য তিনি লিখলেন -
আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে,
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম "সুন্দর',
সুন্দর হল সে।
তুমি বলবে, এ যে তত্ত্বকথা,
এ কবির বাণী নয়।
আমি বলব, এ সত্য,
তাই এ কাব্য।
এ আমার অহংকার,
অহংকার সমস্ত মানুষের হয়ে।
মানুষের অহংকার-পটেই
বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প। (আমি)
ত্রিশের দশকে একদল তরুণ কবি রবীন্দ্র দর্শনকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব ধারা তৈরির অভিপ্রায়ে কাব্য চর্চা শুরু করেন। তাঁরা পঞ্চ পাণ্ডব নামে খ্যাত। তাঁদের মূল আদর্শ ছিল কবিতার ছন্দে গদ্য নিয়ে আসা এবং বিষয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচার উপস্থাপন করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নতুনত্বকে নিজের মত করে ভাবলেন এবং প্রমাণ করলেন গদ্যেরও ছন্দ আছে। এখানে তিনি আধুনিক ছন্দের প্রবহমানতা, ধ্বনিসাম্য সকল অনুষঙ্গ ব্যবহার করলেন। তিনি অবলীলিায় লিখে চললেন ‘বাঁশি’, ‘ক্যামেলিয়া’, প্রভৃতি কবিতা। ‘বাঁশি’ কবিতায় তিনি যে বিষয় এবং ছন্দ ব্যবহার করেছেন তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নতুন করে চিনতে শিখিয়েছে।
কিনু গোয়ালার গলি।
দোতলা বাড়ির
লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর
পথের ধারেই।
লোনা-ধরা দেওয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,
মাঝে মাঝে স্যাঁতা-পড়া দাগ।
মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি
সিদ্ধিদাতা গণেশের
দরজার 'পরে আঁটা।
আমি ছাড়া ঘরে থাকে আরেকটা জীব
এক ভাড়াতেই,
সেটা টিকটিকি। (বাঁশি)
কবিতায় সাধারণের দুর্বিষহ জীবনের সঙ্গে একজন আকবর বাদশার জীবনেরও যে মিল আছে তার প্রমাণ দেখিয়েছেন। কবি এখানে বুঝাতে চেয়েছেন উভয়েই মানুষ; আর মনুষ্যত্ব তাদের এক করেছে। যেখানে জীবন মিলেছে সেখানে তৈরি হয়েছে অন্তর্গত ভাবোচ্ছ্বাসের সংগীত ...
হঠাৎ খবর পাই মনে
আকবর বাদশার সঙ্গে
হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।
বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে
ছেঁড়াছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে
এক বৈকুণ্ঠের দিকে। (বাঁশি)
বিশ্বকবি শুধু সময়কে ধরেছেন তাই নয়, তিনি প্রেমের এক মহিরুহ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন সকলের হৃদয়ে।
আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি
যুগল প্রেমের স্রোতে
অনাদিকালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা
কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে,
মিলনমধুর লাজে--
পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে। (অনন্তপ্রেম)
রবীন্দ্রকাব্যে মানবিকতার জয় ঘোষিত হয়েছে সবসময়। এমনকি তাঁর আপাদমস্তক শিল্পসত্তায় শাসক-শোষিতের বিভাজন করেননি -
এসো হে আর্য, এসো অনার্য,
হিন্দু মুসলমান।
এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ,
এসো এসো খৃস্টান।
এসো ব্রাহ্মণ শুচি করি মন
ধরো হাত সবাকার,
এসো হে পতিত করো অপনীত
সব অপমানভার।
মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা
মঙ্গলঘট হয় নি যে ভরা,
সবারে-পরশে-পবিত্র-করা
তীর্থনীরে।
আজি ভারতের মহামানবের
সাগরতীরে। (ভারত তীর্থ)
ব্যক্তি সংকট মোকাবেলায় তিনি ধৈর্য ধরতে বলেছেন। আমরাও তাঁর কাছে পেয়েছি আশ্রয়-
যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,
সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,
যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,
যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,
মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,
দিক্-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা--
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা। (দুঃসময়)
একই ভাবে বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে সমগ্র বিশ্ব যখন স্থবির রবীন্দ্রনাথ তখন লিখে চলেছেন শান্তির বাণী। জীর্ণ পুরাতনকে ভেঙে নতুনের আহ্বানে আমাদের করেছেন উজ্জীবীত
নূতন সমুদ্রতীরে
তরী নিয়ে দিতে হবে পাড়ি,
ডাকিছে কাণ্ডারী
এসেছে আদেশ--
বন্দরে বন্ধনকাল এবারের মতো হল শেষ,
পুরানো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা
আর চলিবে না। (ঝড়ের খেয়া)
এই পুরাতনকে বাদ দেয়ার জন্য কত বীর প্রাণ দিয়েছে, বিশ্ব হয়েছে নেতৃত্ব শূন্য। তারপরও রবীন্দ্রনাথ আশা ছাড়েননি, তিনি অনড় অবিচল। আমাদেরকে পথ দেখিয়েছেন আর এখানেই তিনি বিদ্রোহ করেছেন চেতনার জগতে! কী অবলীলায় তিনি লিখে চললেন-
বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা
এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা।
স্বর্গ কি হবে না কেনা।
বিশ্বের ভাণ্ডারী শুধিবে না
এত ঋণ?
রাত্রির তপস্যা সে কি আনিবে না দিন।
নিদারুণ দুঃখরাতে
মৃত্যুঘাতে
মানুষ চূর্ণিল যবে নিজ মর্তসীমা
তখন দিবে না দেখা দেবতার অমর মহিমা? (ঝড়ের খেয়া)
জড়ের বুকে প্রাণের স্পন্দন! সে পেয়েছি সাধক কবি রবীন্দ্রনাথের লেখায়। আমরা বুক বেঁধেছি আশায়
পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ ;
তরুশ্রেণী চাহে, পাখা মেলি
মাটির বন্ধন ফেলি
ওই শব্দরেখা ধরে চকিতে হইতে দিশাহারা,
আকাশের খুঁজিতে কিনারা। (বলাকা)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন চেতনার ফেরিওয়ালা তিনি চেতনার বিদ্রোহ করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন আফ্রিকার জন্য লিখেছেন মানব মুক্তির গান -
হায় ছায়াবৃতা,
কালো ঘোমটার নীচে
অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ
উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।
এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে
নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে,
এল মানুষ-ধরার দল
গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে। (আফ্রিকা)
বাউল দর্শন রবীন্দ্রনাথকে ভীষণভাবে উৎসাহিত ও আকৃষ্ট করেছিল। স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্কের ভিত্তিতে শুধু সৃষ্টির নয়, স্রষ্টারও মুক্তি মেলে! শুধু স্রষ্টার বিরাটত্ব নয়, ভক্তের বিরাটত্বকেও তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন তাঁর দার্শনিক প্রজ্ঞার মধ্যে। তিনি লিখেছেন-
তাই তোমার আনন্দ আমার 'পর
তুমি তাই এসেছ নীচে।
আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর,
তোমার প্রেম হত যে মিছে।
বিশ্বকবি, সাধককবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতীয়তাবাদকে অগ্রগণ্য না করে স্বদেশবাদকে করেছেন প্রয়োজনীয়। তাঁর কবিতায় জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বারবার উপস্থাপিত হয়েছে স্বদেশপ্রেম প্রসঙ্গ।
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!
মানুষের অধিকারে
বঞ্চিত করেছ যারে,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
(হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান; গীতাঞ্জলি)
বিশ্বকবির কবিতায় আমরা সাম্যবাদকে পেয়েছি সমাজের গভীরতর তলদেশ থেকে। সাধারণের অন্তরের যে আকুতি তা প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য কবিতায়। দরিদ্র উপেন চরিত্রের মাধ্যমে তিনি রাজা ও প্রজার বৈষম্যকে বাস্তবতার নিরীখে তুলে ধরেছেন। উপেনের করুণ পরিণতি গ্রামবাংলার অসংখ্য গরিবের প্রতিনিধিত্ব করে। একইসঙ্গে স্বদেশপ্রেম অধিকার চেতনার এক অমোঘ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে কবিতাটি।
নমোনমো নম, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!
গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি।
অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধুলি –
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি। (দুই বিঘা জমি)
দুই বিঘা জমি যখন জমিদার দখল করেছে তখন সেই জমির জন্য উপেনের যে কষ্ট এবং তার কাছে জমিটা যত নিরাপদ ছিল এখন আর তা থাকলো না; পরাধিকারে সে দাসত্ব বরণ করেছে -
ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন –
কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সে দিনের কোনো চিহ্ন!
কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ী, ক্ষুধাহরা সুধারাশি।
যত হাসো আজ, যত করো সাজ, ছিলে দেবী – হলে দাসী।।
প্রকৃতি প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রকৃতিবাদকে জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে ধারণ করেছিলেন। এমনকি তাঁর শান্তিনিকেতনের অবস্থান এবং শিক্ষাক্রম তৈরি করেছিলেন প্রকৃতির আদলে।
এই ধূলি
ধূসর অঞ্চল তুলি
বায়ুভরে ধায় দিকে দিকে,
বৈশাখে সে বিধবার আভরণ খুলি
তপস্বিনী ধরণীরে সাজায় গৈরিকে,
অঙ্গে তার পত্রলিখা দেয় লিখে
বসন্তের মিলন-ঊষায়—
এই ধূলি এও সত্য হায়।
এই তৃণ/বিশ্বের চরণতলে লীন—
এরা যে অস্থির, তাই এরা সত্য সবি।
তুমি স্থির, তুমি ছবি,
তুমি শুধু ছবি ৷ (ছবি)
এই কবিতার মাধ্যমে কবি শুধু প্রকৃতিকে নয়, তিনি উপস্থাপন করেছেন প্রকৃতির মাধ্যমে তার চলমানতাকে। জীবন যে চলমান সেটি ছিল তাঁর সাধনা।
শিশুদের জন্য রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন অসংখ্য কবিতা। এখানেও তিনি শিশুদের বন্দীত্ব ঘুচিয়ে নতুন জগতে নিয়ে যাবার দুর্বার আকুতিকে প্রকাশ করেছেন-
তাই তো তোমার নাচে
আমার প্রাণ যেন ভাই বাঁচে,
আমার মন যেন পায় ছুটি,
ওগো তোমার নাচে
যেন ঢেউয়ের দোলা আছে,
ঝড়ে গাছের লুটোপুটি।
অনেক দূরের দেশ
আমার চোখে লাগায় রেশ,
যখন তোমায় দেখি পথে।
দেখতে পায় যে মন
যেন নাম-না-জানা বন
কোন্ পথহারা পর্বতে। (বাউল)
দিন যত গড়িয়েছে কবি নিজেকে তত রূপান্তরিত করেছেন এবং জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি ভাববাদ বস্তুবাদ সব মিলিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন দুটির প্রভাবেই মানব জীবন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শন দুটিই মানুষকে প্রভাবিত করেছে এবং সার্থক জীবন মূলত দুয়ের সমন্বিত রূপ। এই বোধ কবিকে এমন এক দর্শনে উপনীত করেছিল যা তার একান্তই ব্যক্তিগত। যেখানে ভাববাদ বা বস্তুবাদ বা বাউলবাদ বা অস্তিত্ববাদ বা সাম্যবাদ এগুলোর স্বতন্ত্র আধিপত্য নয়; বরং এগুলোর সমন্বয়ে এমন এক নির্যাস সাধক কবি আবিস্কার করেছিলেন যেখানে ব্যক্তির ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা মুখ্য হয়ে উঠেছে।
রূপনারানের কূলে
জেগে উঠিলাম,
জানিলাম এ জগৎ
স্বপ্ন নয়।
রক্তের অক্ষরে দেখিলাম
আপনার রূপ,
চিনিলাম আপনারে
আঘাতে আঘাতে
বেদনায় বেদনায়;
সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,
সে কখনও করে না বঞ্চনা।
আমৃত্যুর দুঃখের তপস্যা এ জীবন,
সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে,
মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ করে দিতে। (রূপনারানের কূলে)
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সকল সামাজিক-প্রাকৃতিক-বৈশ্বিক অনুষঙ্গ গ্রহণ করেছেন তাঁর কাব্য চর্চায়, কিন্তু প্রকাশ করেছেন নিজস্ব আদলে। এজন্যই তিনি সকলের থেকে ভিন্ন এক জগৎ নির্মাণ করেছেন, যে জগৎ আপাদমস্তক শিল্পের জগৎ।
লেখক: সাংস্কৃতিককর্মী ও শিক্ষক, ক্যান্টনমেন্ট কলেজ যশোর