রেজাউর রহমান
চিত্রপটে অনুপস্থিতির সাক্ষ্য ছবি: লেখক
“মৃত ছিলাম জীবিত হলাম কান্নারত ছিলাম সহস্যা হলাম প্রেমের প্রাচুর্য এলো তাইতো আমি অবিনশ্বর প্রাচুর্য হলাম”।
-মওলানা জালাল উদ্দিন রুমি।
একটি অশরীর ই অদৃশ্য কিন্তু বিশ্বাসকে দৃঢ়চিত্তে স্থাপনের জন্য আত্ম সহায়ক তা হল আত্মা। আত্মা হল জীবন্ত সত্তার মূল সারাংশ বা অন্তরাত্মা। চেতনা এক অস্পর্শী সত্তা যা শুধুই অনুভূত হয় কিন্তু তার কোন অন্ত নেই। বলা যায় জীব সত্তার অনুভূতির ক্রিয়াকর্মের প্রধান হাতিয়ার এই পরমাত্মা।
“তোমার চোখ বলে দেয় তোমার আত্মার শক্তি কোথায়”
তাহলে কি মানব শরীরের চোখের মধ্যে আত্মার উপস্থিতি? হয়তো কিছুটা সৃষ্টির মধ্যেই মানুষই অনুভূতি ব্যাক্ত করতে সক্ষম এবং তা তার নানা ভঙ্গির মধ্য দিয়ে । দৃষ্টি প্রথমে নিরীক্ষণ করে এবং চেতনা তার সম্মোহনী ক্ষমতা দিয়ে মানবের অনুভূতির সঞ্চার করে। তবে এটা পরিষ্কার আত্মা বিনে দেহ জড় বস্তুর শামিল। আত্মার মধ্য দিয়ে নিজেকে খুঁজে পাই মানব সত্তার মূল অংশকে। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে মানুষ খুঁজে ফিরে নিজের সত্তার অংশকে, এর উপর নির্ভর করে তার নানা অনুভূতি প্রেম কান্না সুখ হাসি সব কিছুই।নানা উপায়ে প্রকাশের চেষ্টারত এই মানব সমাজ। এর এক, এক জন তার প্রকাশকে আলাদা করেছে তার সত্তার সংবেদনশীলতার উপর নির্ভর করে।
এমনইভাবে শিল্পী ফারজানা আহমেদ উর্মি আত্ম উপস্থিতির সাক্ষ্য দিচ্ছেন রং তুলি ক্যানভাস কে ব্যবহার করে। উর্মি শিল্পশিক্ষালয়ে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন, এবং তা শেষ করেছেন এবং তা কাজে লাগিয়েছেন নিজেকে খোঁজার ভেতর দিয়ে। শিল্পী উর্মির ক্যানভাস যে নিরীক্ষাধর্মী তা বলবার অবকাশ থাকে না এই কারণে যে শিল্পী শিক্ষালয়ের পরিমাপযোগ্য শিক্ষার ভেতর দিয়ে গেলেও আত্মশিল্পকে বিন্যস্ত করেছেন আত্মার শক্তিকে ব্যবহার করে। চিত্রকলায় মানব শরীর মানবের মুখচ্ছবি অংকন খুবই মৌলিক বিষয় কিন্তু এই মুখচ্ছবির ভেতর কতখানি সত্যাগত তা প্রকাশ করা খুবই দূরহ বিষয়, তা বিশ্ব শিল্পের নানা শিল্পীর অংকন শৈলী বলে দেয়। শিল্পী উর্মি সেই দূরহ কাজটি করছেন। কলা কেন্দ্রের দেয়ালে অসংখ্য চোখ তা কখনো চেনা কখনো না চেনা, কখনো চেতনে বা অবচেতনের। উর্মির ক্যানভাসের মুখগুলো দেখলে মনে হয় আদিমতাকে বহন করে।
চোখগুলো যেন স্থির, পৃথিবী দেখছে শতাব্দী ধরে কিন্তু নিজেকে খুঁজে পেতে চাইছে। শিল্পী রং ব্যবহারে স্বাধীন। আসলে নিজেকে খুঁজতে হলে পার্থিব শৃঙ্খলা থেকে আগেই নিজেকে মুক্ত করতে হয়, উর্মী সেটা পেরেছেন। তবুও নিজেকে খুঁজে ফেরা চলমান শিল্পীর চিত্রপটে নিজেকে স্থাপন প্রতিস্থাপনের যে দ্বান্দ্বিক লড়াই তা খানিকটা টের পাওয়া যায়। উর্মি কোথাও থিতু হচ্ছেন না নিজেকে খুঁজে পেতে, ফলে চিত্রকলার ভাষা নিজস্ব এক সাক্ষ্য দিচ্ছে। শিল্পী পাবলো পিকাসো চারপাশের চেনা মুখ গুলোর অভিব্যক্তিকে একটি ফর্মে এনে দেখিয়েছিলেন, শিল্পী লুসিয়ান ফ্রয়েডের ক্যানভাসের মুখগুলোর চাহনি খুবই স্পষ্ট ফলে বলা যায় প্রতিকৃতি অঙ্কনে নেত্রদ্বয় এক প্রধান সাক্ষ্য বহন করে। উর্মির চিত্রপটে অভিব্যক্তিক চাহনি কখনো নিজের বা নিজের সাথে দান্দ্বিক চরিত্রের অপর কাউকে দাঁড় করিয়ে নিজেকে খুঁজে ফেরার এক লড়াই।
“আপনারে আপন চিনেছে যে জন দেখতে পাবে সেই রূপের কিরণ”
-ফকির লালন সাঁই।
শিল্পী উর্মির চিত্রপট নিজেকে খুঁজে ফেরার এক নিরন্তন যাত্রার সাক্ষ্য দিচ্ছে। শিল্পী পেলোবতাময় কোন বিষয়বস্তুকে গ্রহণ করেনি, নিজের সাথে নিজের উপস্থিতি, অনুপস্থিতির সাক্ষ্য দিচ্ছেন। গ্যালারি কলা কেন্দ্রের দেয়াল জুড়ে সেই বিবরণ। উর্মির চিত্রপট আমাদের ভবিষ্যতের খুঁজে ফেরার দিকে ধাবিত করে, করবে।
লেখক: চিত্রশিল্পী ও সমালোচক