ক্রীড়া ডেস্ক
ফরাসি তারকা ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পে ছবি: সংগৃহীত
সামান্য একটু মস্করা করতে গিয়েই বড় ধরনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিপাকে পড়েছেন ফরাসি ফুটবল সেনসেশন কিলিয়ান এমবাপ্পে। চীনের প্রতিষ্ঠাতা নেতা মাও সে-তুংকে নিয়ে করা এক আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে দেশটিতে তাঁর বিরুদ্ধে তুমুল ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে হয়েছে যে, এমবাপ্পের বড় বড় বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি তাঁর খেলা ও বিজ্ঞাপন প্রচারও বন্ধ করে দিয়েছে চীন।
সম্প্রতি ‘দ্য ব্রিজ’ নামের একটি ফরাসি টকশোতে অংশ নেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। সেখানে ইন্টারনেটে নিজের পছন্দের মিম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি এমন এক মন্তব্য করে বসেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার ঝড় তুলেছে। এমবাপ্পে জানান, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মিম হলো— যেখানে তাঁর মুখের সাথে একজন "চীনা স্বৈরশাসকের" শরীর এডিট করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও তিনি সরাসরি কারও নাম নেননি, তবে স্পষ্টতই সেটি চীনের ইতিহাসের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব মাও সে-তুংয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে তৈরি একটি মিম ছিল। ফরাসি এই তারকা হাসতে হাসতে জানান যে, মিমটি তাঁর কাছে বেশ উপভোগ্য এবং বন্ধুদের সাথেও তিনি এটি শেয়ার করেন।
ভিডিও ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই চীনের সাইবার দুনিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। দেশটির জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ‘উইবো’-তে এমবাপ্পের এই মন্তব্যকে চীনের ইতিহাস ও জনগণের প্রতি চরম অসম্মান হিসেবে দেখা হয়।
এই ঘটনার প্রভাব পড়েছে মাঠের বাইরের কার্যক্রমেও। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল সিসিটিভি (CCTV) তাৎক্ষণিকভাবে লা লিগার খেলা এবং এমবাপ্পের সব ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার স্থগিত করে দেয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানিয়েছে, চীনা জনগণের জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন যেকোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে বয়কট করা হবে।
বাণিজ্যিক বাজারেও বড় ধাক্কা খেয়েছেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। ডংপেং, মেংনিউ ও মিল্কগ্রাউন্ডের মতো শীর্ষস্থানীয় চীনা ব্র্যান্ডগুলো এমবাপ্পের সাথে তাদের সব চুক্তি বাতিল করেছে। এছাড়া ডিওর ও হাবলটের মতো আন্তর্জাতিক নামী ব্র্যান্ডগুলোও চীনের বাজার থেকে এমবাপ্পেসংশ্লিষ্ট সব কনটেন্ট সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিলে চাইনিজ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (CFA) রিয়াল মাদ্রিদের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদলিপি পাঠায় এবং ক্লাব ও খেলোয়াড়ের পক্ষ থেকে নিঃশর্ত ক্ষমার দাবি জানায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্ষতি এড়াতে রিয়াল মাদ্রিদ দ্রুত চীনা জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। পাশাপাশি, লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাসও চীনা ভক্তদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং স্পেনে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও জিংয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রক্ষার আশ্বাস দেন।
তীব্র চাপের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চেয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। সামাজিক মাধ্যমে এক বার্তায় তিনি সাফ জানিয়ে দেন, কাউকে আঘাত করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না এবং চীনা সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল।
তবে এমবাপ্পের এই ক্ষমাপ্রার্থনাতেও বরফ গলেনি। চীনের প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘পিপলস ডেইলি’ এবং ‘গ্লোবাল টাইমস’ কঠোর সম্পাদকীয় প্রকাশ করে জানিয়েছে, চীন থেকে ব্যবসা করে মুনাফা লুটবেন অথচ দেশের ইতিহাসকে অসম্মান করবেন— এমন দ্বিমুখী নীতি মেনে নেওয়া হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এমবাপ্পের এই খামখেয়ালি রসিকতা তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। লা লিগার সম্প্রচার ও ব্র্যান্ডগুলোর আস্থা ফিরিয়ে আনতে ফরাসি তারকার সামনে এখন বেশ বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।