আবদুর রহমান সোহাগ
আবদুর রহমান ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি সাবিরা সুলতানা মুন্নি একটি ফৌজদারি মামলায় যশোরের আদালতে আসামী হিসেবে হাজিরা দিতে এসেছিলেন। কাঠগড়ার বাইরে দাঁড়ানো দেখে বিচারক তাঁকে আসামীর কাঠগড়ায় উঠতে বলেন। এতে তাৎক্ষণিক কিছু না বললেও শুনানি শেষে আদালতের দরজা থেকেই সংসদ সদস্য বিচারককে তিরস্কার করতে শুরু করেন এবং তার দলের নেতাকর্মীরাও তাতে অংশ নেন।
তিনি বলতে থাকেন-"বিগত ১৭ বছরে আমাকে বিচারক সম্মান দেখিয়ে কাঠগড়ায় না উঠালেও আজ তাকে কাঠগড়ায় উঠালো হলো কেন?" এমন সময় কেউ কেউ বিচারককে ফ্যাসিস্ট লীগও বলে ফেললেন। তখন বিচারককেও কিছুটা বিব্রত হতে দেখা যায়। তবে আইনজীবীদের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং তাঁরা চলে যান।
এ ঘটনায় প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক একজন সর্বোচ্চ মর্যাদার মানুষ ক্ষমতাসীন দলের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্যকে বিচারক কাঠগড়ায় উঠতে বাধ্য করলেন! এটা আইন সম্মত কি না? এটা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন থাকতে পারে। তাই আমি কাউকে ছোট করা নয় বরং আইন কী বলে সেই অ্যাকাডেমিক বিশ্লেষণ নিয়ে এই লেখার অবতারণা করছি।
বাংলাদেশে ফৌজদারি কার্যবিধি আইন অনুয়ায়ী কোনো মামলায় আসামী হলে আসামীকে অবশ্যই আদালত কক্ষে তার জন্য নির্ধারিত স্থানে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এবং এটা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে-"সকল নাগরিকই আইনের চোখে সমান এবং সকলেই আইনের সমান আশ্রয় গ্রহণের অধিকারী।" সুতরাং তিনি সাধারণ মানুষ না কি সংসদ সদস্য তা বিবেচ্য বিষয় নয়।
" সংসদ সদস্যের উচিৎ ছিল কোন উচ্চবাচ্য না করে আদালতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে আসামীর কাঠগড়ায় ওঠা। কারণ, তিনি নিজেই রাষ্ট্রের একজন আইন প্রণেতা। সন্তুষ্ট চিত্তে আইন-আদালতের নিয়ম মেনে চলা তার উচিত ছিল।"
প্রশ্ন হল তাহলে পূর্বে কেন বিচারক তাকে কাঠগড়ায় উঠতে বাধ্য করেননি?কারণ হতে পারে,ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা রক্ষায় বিচারক শিষ্টাচারের অংশ হিসেবে তাকে কাঠগড়ায় না তুলে নিচে দাড়ানোকে মেনে নিয়েছেন তবে এটি কোন আইন নয় বরং বিচারক তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ব্যবহার করে অনুকম্পা প্রদর্শন করেছেন মাত্র।তার মানে এই নয় যে সকল বিজ্ঞ বিচারকগণই একই রকম অনুকম্পা প্রদর্শন করবেন বা করতে বাধ্য।বরং বর্তমান বিচারক আইন মান্য করেছেন।আসামীকে আসামী হিসেবে বিবেচনা করেছেন যা রুল অব ল প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরী।
সংসদ সদস্যের উচিৎ ছিল কোন উচ্চবাচ্য না করে আদালতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে আসামীর কাঠগড়ায় ওঠা। কারণ, তিনি নিজেই রাষ্ট্রের একজন আইন প্রণেতা। সন্তুষ্ট চিত্তে আইন-আদালতের নিয়ম মেনে চলা তাঁর উচিত ছিল।
আরও পড়ুন-
যদি কোন যৌক্তিক কারণে তিনি আদালতে না আসতে চান তাহলেও আইনে সুযোগ আছে।ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ২০৫ ধারায় তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরার আবেদন করতে পারতেন।বিচারক সন্তুষ্ট হলে নিজে হাজির না হয়েও আইনজীবীর হাজিরার মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম চলমান রাখার সুযোগ দিতেন।
আমাদের সবারই উচিৎ আদালতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আর দায়িত্বশীল ব্যক্তি বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের একজন আইন প্রনেতার জন্য বিষয়গুলো আরও বেশি জরুরী।
লেখক: আইনজীবী ও বাংলাদেশ ল'ইয়ার্স কাউন্সিল, যশোরের সাংগঠনিক সম্পাদক ।
* মতামত লেখকের নিজস্ব