আন্তর্জাতিক ডেস্ক
লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্ট গিতানাস নাউসেদার প্রাপ্ত উপহার আগ্নেয়াস্ত্র ছবি: সংগৃহীত
ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশে ফিরে নিজের লাগেজ খুলতেই চমকে ওঠেন বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ওয়েভার। ব্যাগের ভেতর সাজানো রয়েছে একটি হ্যান্ডগান এবং সাথে আসল গুলি! তবে এটি কোনো নিরাপত্তা ত্রুটি নয়, বরং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের দেওয়া এক ব্যতিক্রমী বিদায়ী উপহার।
গত বুধবার আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের সমাপনীতে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতাদের প্রত্যেককে একটি করে বিশেষ ভিনটেজ রিভলবার ও আসল গুলি উপহার দেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। উপহারের তালিকায় থাকা স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার থেকে শুরু করে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি—সবাই পেয়েছেন এই বিশেষ অস্ত্র। প্রতিটি রিভলবারের ব্যারেলে সংশ্লিষ্ট বিশ্বনেতার নাম বিশেষভাবে খোদাই করা ছিল।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ব্যতিক্রমী উপহারের মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা ও অগ্রগতি তুলে ধরা।
কী এই বিশেষ উপহার?
লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্ট গিতানাস নাউসেদার কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, উপহার দেওয়া এই আগ্নেয়াস্ত্রটি মূলত ১৯৯০-এর দশকে তুরস্কের রাষ্ট্রায়ত্ত অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘এমকেই’ কর্তৃক তৈরি ‘গুমুসায় .৩৫৭ ম্যাগনাম’ (Gumusay .357 Magnum)।
বৈশিষ্ট্য: ছয় চেম্বারের এই ভিনটেজ রিভলবারটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অস্ত্র সংগ্রাহকদের কাছে বেশ বিরল।
প্যাকেজিং: প্রতিটি রিভলবার একটি সুদৃশ্য কাঠের বাক্সে সাজানো ছিল, যার ওপর তুরস্কের জাতীয় পতাকা ও ন্যাটোর লোগো খোদাই করা ছিল।
ফলক: বাক্সের ভেতরের একটি ফলকে তুর্কি ও ইংরেজি ভাষায় লেখা ছিল, ‘গুমুসায়, আমাদের দেশে তৈরি প্রথম রিভলবার ধরনের হ্যান্ডগান।’
উপহার পেয়ে বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া
হঠাৎ এমন ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ উপহার পেয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা ভিন্ন ভিন্ন আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছেন:
বেলজিয়াম ও ইতালি: বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ওয়েভার দেশে ফিরেই রিভলবারটি ব্রাসেলস বিমানবন্দরের পুলিশের কাছে নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য জমা দেন। অন্যদিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির রিভলবারটি রোমের রাষ্ট্রীয় কার্যালয়ে অন্যান্য উপহারের সাথে সংরক্ষিত হয়েছে।
যুক্তরাজ্য: ডাউনিং স্ট্রিটের একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে রিভলবারের সঙ্গে একটি ক্লিনিং কিট এবং ৫০০ রাউন্ড গুলি দেওয়া হয়েছে।
নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন: আইনি আনুষ্ঠানিকতার কারণে এই দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের রিভলবারগুলো আপাতত আঙ্কারায় নিজ নিজ দেশের দূতাবাসে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ডাচ প্রশাসন অস্ত্রটি স্থায়ীভাবে ব্যবহারের অযোগ্য করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কানাডা: কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি কিছুটা রসিকতা করে বলেন, তাঁর দেশের ঐতিহ্যবাহী ‘ম্যাপল সিরাপের’ সঙ্গে তুরস্কের এই উপহারের কোনো তুলনাই চলে না। তিনি জানান, আগ্নেয়াস্ত্রটি ইতিমধ্যেই ব্যবহারের অযোগ্য করা হয়েছে এবং এটি কানাডার জাতীয় যুদ্ধ জাদুঘরে স্থান পেতে পারে।
ইউরোপীয় কমিশন ও গ্রিস: ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী তাঁদের উপহারটি নিজ নিজ দেশের সামরিক জাদুঘরে দান করার পরিকল্পনা করেছেন।
পোল্যান্ড: পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কির এক সহকারী জানান, তাঁদের উপহারটি এখনো ওয়ারশ বিমানবন্দরে শুল্ক ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশ্ব বাজারে তুরস্কের অস্ত্রের দাপট
বর্তমানে তুরস্কে মূলত আধুনিক সেমি-অটোমেটিক পিস্তল তৈরি হওয়ায় এই পুরোনো ‘গুমুসায়’ রিভলবারটি একটি দুর্লভ সংগ্রহ। সাশ্রয়ী মূল্যের পিস্তল ও শটগান রপ্তানি করে ইউরোপের বেসামরিক আগ্নেয়াস্ত্রের বাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে তুরস্ক, যা ইতালি ও বেলজিয়ামের মতো ঐতিহ্যবাহী নির্মাতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
জেনেভাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘স্মল আর্মস সার্ভে’-র তথ্যমতে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের ছোট আগ্নেয়াস্ত্র রপ্তানি করেছে তুরস্ক। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ছোট আগ্নেয়াস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে আঙ্কারা। আর সেই সাফল্যের জানান দিতেই বিশ্বনেতাদের এই ভিনটেজ রিভলবার উপহার দিলেন এরদোয়ান।