বিশেষ প্রতিবেদক
ইনফোগ্রাফি ছবি: এআই প্রণীত
চার দশকেও দেখা যায়নি এমন বৈরী আবহাওয়ার মুখোমুখি দেশ। গত ৪০ বছরের মধ্যে জুলাই মাসে একদিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ভেঙে প্রকৃতি যেন ধারণ করেছে এক রুদ্ররূপ। টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে দেশের ১০টি নদ-নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যার ফলে বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন ভয়াবহ বন্যার কবলে। বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে এবং ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অল্প সময়ে অধিক বৃষ্টির কারণে দেশের বেশিরভাগ স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর প্রভাবে এবারের বর্ষায় স্বল্প সময়ে এই অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রহমান জানান, জুলাই মাসে একদিনে এত বেশি বৃষ্টিপাত গত ৪০ বছরের রেকর্ডে বিরল। অতীতে ১৯৮৩ সালের ৫ জুলাই সর্বোচ্চ ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। তবে চলমান দুর্যোগে গত বুধবারই চট্টগ্রামে ৩৯৪ মিলিমিটার এবং শুক্রবার সাতক্ষীরায় ২২৭ মিলিমিটারের মতো রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে। যশোরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুক্রবার বেলা ২টা পর্যন্ত ২০ ঘণ্টায় যশোরে ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে বৃহস্প্রতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। যা প্রমাণ করে প্রকৃতি কতটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে।
খাল বিল জলাশয় ভরাটের ফলে আমাদের নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। যার কারণে বৃষ্টি কল্যাণের পরিবর্তে আতংকের নাম হয়ে উঠেছে।
একজন প্রবীণ নাগরিক বলেন ‘আগেকার দিনে বৃষ্টি মানে ছিল ফসলের হাসি, আজ বৃষ্টি যেন নাগরিক জীবনে এক আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি। প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়েছে; মেঘের গর্জনে আজ বৃষ্টির কবিতার চেয়েও মানুষের নিরাশ্রয় হওয়ার ভয়টাই বেশি চোখে পড়ছে।’
টানা বৃষ্টিতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। গ্রামের দুর্ভোগ বাড়ছে, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা শহরে, যেখানে অল্প বৃষ্টিতেই বিভিন্ন অঞ্চলে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে, তবে এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। বঙ্গোপসাগরে নতুন করে লঘুচাপ সৃষ্টির আশঙ্কা থাকায় চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত এবং নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক জানান, দেশের আট বিভাগেই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, তবে সোমবার থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে।