আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মিশরের তৈরি অক্টোগন ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বজুড়ে সামরিক ও প্রতিরক্ষা সদর দফতরের দিক থেকে এত দিন আমেরিকার ‘পেন্টাগন’ ছিল একচ্ছত্র সেরা। তবে এবার আমেরিকার সেই ঐতিহাসিক পেন্টাগনের মুকুট খসে গেল। এমনকি এই আয়তনের দৌড়ে হেরে গেছে মহাশক্তিধর চীন বা ড্রাগনের দেশও। সবাইকে তাক লাগিয়ে পিরামিডের দেশ মিশরে তৈরি হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক কমান্ড সেন্টার। আটটি কোণ বা আটটি বাহুবিশিষ্ট অনন্য জ্যামিতিক নকশায় তৈরি এই বিশাল ভবনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য অক্টাগন’। গত ৪ জুলাই মিশরের নতুন প্রশাসনিক রাজধানীতে এই কৌশলগত কমান্ডের সদর দফতরটি আনুষ্ঠানিকভাবে লোকচক্ষুর সামনে আনা হয়। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফতাহ এল-সিসি নিজে উপস্থিত থেকে এই চোখধাঁধানো ও আধুনিক স্থাপনাটির শুভ উদ্বোধন করেন। ইতিমধ্যেই এই অক্টাগন বিশ্বজুড়ে সামরিক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মনে তুমুল কৌতূহল তৈরি করেছে।

আমেরিকার প্রতিরক্ষা সদর দফতর ‘পেন্টাগন’ ছবি -সংগৃহীত
আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশাল জমির ওপর অবস্থিত প্রতিরক্ষা সদর দফতর ‘পেন্টাগন’ একটি পঞ্চভুজাকৃতি ভবন। আয়তনের দিক থেকে এটিই এত দিন ছিল বিশ্বের অন্যতম বড় এবং প্রভাবশালী ভবন। যেখানে প্রায় ২৩ হাজার সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী সার্বক্ষণিক কাজ করেন। তবে মিশরের এই নতুন ‘অক্টাগন’ আড়েবহরে আমেরিকার সেই পেন্টাগনের তুলনায় প্রায় ৭৫০ গুণ বড়। কায়রো থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পূর্বে মরুভূমির বুকে প্রায় ২২ হাজার একর বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে মিশরের এই চোখধাঁধানো প্রতিরক্ষা নগরী। এর হাত ধরে সামরিক অবকাঠামোতে আমেরিকাকে পুরোপুরি টেক্কা দিল আফ্রিকার এই দেশ। অন্যদিকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সামরিক কমান্ড সেন্টার তৈরির দৌড়ে রয়েছে মহাশক্তিধর চীনও। চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নির্দেশে পেন্টাগনের ধাঁচেই সেখানে যুদ্ধকালীন একটি বিশাল সামরিক কমান্ড সেন্টার তৈরি হচ্ছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে চিনের এই ‘সুপার পেন্টাগন’ আমেরিকার পেন্টাগনের চেয়ে আকারে অন্তত ১০ গুণ বড় হবে। তবে চীন তার কাজ শেষ করার আগেই আপাতত ড্রাগনভূমিকেও বড় ব্যবধানে পেছনে ফেলে দিয়েছে মিশরের এই অক্টাগন।
অষ্টভুজ জ্যামিতিক নকশায় নির্মিত আটটি প্রধান প্রধান ভবন নিয়ে এই অক্টাগন চত্বরটি গঠিত। মিশরের রাষ্ট্রীয় তথ্য পরিষেবা জানিয়েছে, এই চত্বরটিতে মোট ১৩টি সমন্বিত কৌশলগত ও রসদ সরবরাহের সুনির্দিষ্ট অঞ্চল বা জোন রয়েছে। পুরো কাঠামোটি একাধিক বিশাল বিশাল ভবনের সমন্বয়ে গঠিত হলেও একটি মাত্র কেন্দ্রীয় কমান্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে সবগুলো ভবন পরস্পরের সঙ্গে শক্তভাবে সংযুক্ত। এই নতুন প্রশাসনিক রাজধানীতে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি দেশের সামরিক প্রশাসনকেও এবার এই আধুনিক পরিকাঠামোর আওতায় আনা হলো। এই কৌশলগত কমান্ড সদর দফতরটির উদ্বোধনের পর মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফতাহ এল-সিসি জানিয়েছেন, এই স্থাপনার সাহায্যেই দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সমস্ত শাখার পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের কাজকে এবার এক ছাতার নিচে আনা সম্ভব হবে। এটি বাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করা এখন মিশরের জন্য অনেক সহজ হয়ে উঠবে। সেনাবাহিনীর দক্ষতা বাড়িয়ে যেকোনো বৈশ্বিক হুমকির জন্য তাদের সর্বদা প্রস্তুত করা সম্ভব হবে এই স্থাপত্যের মাধ্যমে।
এই বিশালাকার অক্টাগন চত্বরের ভেতরে কী কী রয়েছে, তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক। এখানে তৈরি করা হয়েছে একটি উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন কৌশলগত তথ্যকেন্দ্র। সেখানে মিশরের সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। রয়েছে একটি অত্যাধুনিক কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার। যুদ্ধ বাধলে বা কোনো জাতীয় সংকট তৈরি হলে সেখানে বসেই সরাসরি সেনা পরিচালনার নির্দেশ দিতে পারবেন মিশরের সেনাবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারেরা। এছাড়া রয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাজকর্ম চালানোর জন্য নির্দিষ্ট একটি বিশাল ভবন। একই সাথে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সমন্বিত অপারেশন সেন্টারও থাকছে এখানে। দ্রুত বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য এতে যুক্ত করা হয়েছে অত্যন্ত উন্নত যোগাযোগ ও সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সর্বোচ্চ সাইবার নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করে এখানে জাতীয় পর্যায়ের তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও সুরক্ষার কঠোর বন্দোবস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপদ ডেটা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন সামরিক শাখার মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
কার্যক্রমের দিক থেকে ক্ষুদ্র একটি প্রশাসনিক ও প্রতিরক্ষা নগরী হিসাবে পরিকল্পিত এই ক্যাম্পাসের পুরো কাজকে মূলত চারটি প্রধান বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো— কমান্ড, লজিস্টিক বা রসদ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ এবং জরুরি ব্যবস্থাপনা। সাধারণ প্রশাসনিক কাজকর্ম থেকে শুরু করে হঠাৎ উদ্ভূত কোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে সামরিক অভিযান পরিচালনার কাজ—সমস্ত কিছুই একই চত্বর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া পুরো চত্বরটি কমান্ড, কন্ট্রোল, অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, কম্পিউটার, ইন্টেলিজেন্স, নজরদারি এবং গোয়েন্দা অনুসন্ধানের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) সমৃদ্ধ বিভিন্ন আধুনিক ব্যবস্থায় সজ্জিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রিয়্যাল-টাইম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সমন্বিত সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা আরও জোরদার হবে বলে সমর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অক্টাগনের ঠিক মাঝখানে রয়েছে সংকটকালে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত ‘ওয়ার রুম’। এই ওয়ার রুমের নিরাপত্তা এতটাই আঁটোসাঁটো যে সেখানে সাধারণ মানুষের তো দূরের কথা, বিনা অনুমতিতে একটি মাছির গলারও ফাঁক নেই। এই সুরক্ষিত ঘর থেকেই যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত সংঘাত বা যেকোনো জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা ও সমন্বয় করা হবে। এ ছাড়াও দেশ-বিদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জন্য এখানে তৈরি করা হয়েছে সুবিশাল কনফারেন্স হল। মিশরীয় সেনাবাহিনীর নিজস্ব আধুনিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও লজিস্টিক সহায়তাও এই চত্বরটির মধ্যেই রাখা হয়েছে। সেই সাথে কর্মকর্তাদের থাকার জন্য তৈরি করা হয়েছে সুনির্দিষ্ট আবাসন ব্যবস্থা।

সামরিক সদরদফতর ড্রাগন তৈরি করছে চিন ছবি - সংগৃহীত
বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান তীব্র নিরাপত্তা সংকট ও আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মিশরের এই ‘অক্টাগন’ গোটা দুনিয়ার কাছেই আলাদা ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব আদায় করে নিয়েছে। যদিও মিশর এই মুহূর্তে কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক যুদ্ধে সরাসরি জড়িত নয়, তবুও পশ্চিম এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল ও উত্তপ্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটি আগেভাগেই তার সামরিক প্রস্তুতি ও কমান্ড সক্ষমতা জোরদারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। গাজায় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়া সংঘাত, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং প্রতিবেশী দেশ লিবিয়া ও সুদান বা টালমাটাল অবস্থা মিশরের জাতীয় নিরাপত্তাকে উদ্বেগে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সুরক্ষিত কমান্ড সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা মিশরের জন্য অপরিসীম ছিল। অক্টাগনের উন্নত কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়া দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে সাহায্য করবে। ফলে যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে পিরামিডের দেশের স্থল, নৌ এবং বিমানবাহিনী একই ছাদের নিচ থেকে চোখের পলকে দ্রুত সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের নিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে পারবে।