ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: প্রতীকী
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের আগামী অর্থবছর (২০২৬-২৭)-এর জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১.২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ৩.৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যা গত এপ্রিলে ৪.৬ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বড় ধরনের কাটছাঁট।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করা হয়েছিল, তা এখনো দৃশ্যমান হয়নি বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি চলতি অর্থবছরের জন্য তাদের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ব্যাপকভাবে কমিয়ে এনেছে।
আজ (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত সর্বশেষ 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট'-এ বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, "বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।"
এই পটভূমিতে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের আগামী অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১.২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ৩.৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যা গত এপ্রিলে ছিল ৪.৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বড় ধরনের অবমূল্যায়ন।
এই সংশোধিত পূর্বাভাসের ফলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৩.৪৫ শতাংশের নিচে নেমে যাচ্ছে, যখন কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কায় দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছিল।
গত মাসে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) বাংলাদেশের আগামী অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছিল, যা জুলাইয়ে ৪.৫ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৪.৭ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছিল।
বিশ্বব্যাংক ও এডিবি—উভয় সংস্থার পূর্বাভাসই চলতি অর্থবছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের চেয়ে অনেক নিচে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ঋণের মন্দাগতি এবং পূর্বে ধারণাকৃত অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতির এই অবনতি ঘটেছে।"
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতিও ধীরগতির থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, "স্বল্পমেয়াদে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে এবং দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তৈরি পোশাকের রপ্তানি গতি হারিয়ে ফেলবে।"
জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেই চলেছে
বিশ্বব্যাংক হিসেব করে দেখেছে যে, আগের অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৪ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা টানা তিন বছরের অর্থনৈতিক মন্দাকে নির্দেশ করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মূলত বিনিয়োগ এবং নিট বাণিজ্যের মন্দাভাবের কারণেই এই ধীরগতি তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, "রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমার সুফল মিললেও জ্বালানি খাতের সংকট, বর্ধিত উৎপাদন খরচ এবং অতিরিক্ত সুদের হারের প্রভাব বেশি থাকায় টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত হয়েছে।"
সংস্থাটি আরও জানায়, "ব্যাংকিং খাত এখনো চরম নাজুক অবস্থায় রয়েছে।" ২০২৬ সালের মার্চে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত কমে ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে নেমে যায় এবং ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে দাঁড়ায় ৩২.৮ শতাংশে।
তবে, এর পরের অর্থবছরে (২০২৭-২৮) দেশটি ৩.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
এদিকে, মূল্যস্ফীতি ৮.৬ শতাংশের মতো উচ্চ পর্যায়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭.৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। এক বছর আগে এটি ছিল ৮.৭ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রমাগত উচ্চমূল্য এবং কর্মসংস্থান হারানোর ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমে গেছে।
এর ফলে, দৈনিক ৩ ডলার আয় মানদণ্ডের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের হার ১.১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০.১ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার মানে নতুন করে অতিরিক্ত ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে।
একই সাথে আয় বৈষম্যও ০.৯ গিনি পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর ভোগ কমে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরে।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য নিয়োজিত বিশ্বব্যাংক বিভাগের পরিচালক জঁ পেসমে বলেন, "অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।"
তিনি আরও বলেন, "দরিদ্রদের সুরক্ষা এবং নতুন ও ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো ত্বরান্বিত করতে দেশের অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময় এখনই।"
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক পূর্বাভাস
'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' মূলত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আঞ্চলিক প্রতিবেদন 'সাউথ এশিয়া ইকোনমিক আপডেট'-এর সাথে সম্পর্কিত একটি প্রকাশনা, যা আজই প্রকাশিত হয়েছে। এতে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও নীতিগত অগ্রাধিকার বিশ্লেষণ করা হয়।
শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর ভর করে বৈশ্বিক ধাক্কা সামলে চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৬.৯ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে নানা প্রতিকূলতা বাড়ায় ২০২৭ সালে এই প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৬.৭ শতাংশে নামতে পারে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, "চ্যালেঞ্জিং বৈশ্বিক পরিবেশ সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়া অসাধারণ ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। তবে এই গতি ধরে রাখতে এবং আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এই অঞ্চলকে প্রবৃদ্ধির নতুন উৎসে বিনিয়োগ করতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "দ্রুত বাড়তে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের সুযোগ নিতে দেশগুলোর উচিত দক্ষতা, অবকাঠামো এবং সহায়ক পরিবেশে বিনিয়োগ করা, যাতে শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠানগুলো এআই-এর সম্ভাবনার সঠিক ব্যবহার করতে পারে।"
প্রতিবেদনে অন্বেষণ করা হয়েছে যে কীভাবে এআই-এর কৌশলগত ব্যবহার প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, "দক্ষিণ এশিয়ায় এআই-এর ব্যবহার বাড়ছে, তবে উন্নত অর্থনীতিগুলোর তুলনায় তা এখনো অনেক পিছিয়ে। এই ব্যবধান সত্ত্বেও এআই ব্যবহারের গতি বাড়ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বাজারের সুযোগ খুঁজতে এআই ব্যবহার করছে। ভারতের ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে এআই ভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস পৌঁছানো এবং বাংলাদেশে এআই-সহায়তায় রেটিনা পরীক্ষার মতো জনসেবায় সরকারগুলো এআই-এর ব্যবহার বাড়াচ্ছে।"
এশিয়ার জন্য বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রাঞ্জিস্কা ওনসোর্গে বলেন, "এআই গ্রহণ করার ফলে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানির সুযোগ বিস্তার এবং সরকারি সেবা বৃদ্ধি পেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের পথ বদলে যেতে পারে। তবে এই সুফল পেতে সরকারগুলোকে মৌলিক খামতিগুলো দূর করতে হবে যা এআই গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।"