নিজস্ব প্রতিনিধি
ছবি: ধ্রুব নিউজ
ভবদহ অঞ্চলের চার দশকের স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিকল্পিত নদী খননের সাথে টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) বা জোয়ারাধার চালু এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমডাঙ্গা খালের বিস্তৃত পুনর্খনন সম্পন্ন না করা হলে কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারি দিয়েছে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি। আগামী মাঘী পূর্ণিমার আগেই কার্যকর টিআরএম বাস্তবায়ন না হলে চলমান নদী খনন প্রকল্পের বিপুল অর্থ জলে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন আন্দোলনের নেতারা।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাংলাদেশ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির যশোর জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ এই দাবি ও হুশিয়ারি দেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক গাজী আবদুল হামিদ। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন সংগঠনের অন্যতম নেতা শেখর বিশ্বাস।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, গত জুলাইয়ের ভারী বৃষ্টিতে যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার একাংশের দুই শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। দীর্ঘ তিন মাস ধরে লাখো মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির ও শ্মশান-কবরস্থান পানির নিচে তলিয়ে থাকায় ওই জনপদে খাদ্যসংকট ও চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
সংগ্রাম কমিটির নেতারা বলেন, বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ কিলোমিটার নদী সংস্কার কাজ চলমান থাকলেও মূল সমাধান অর্থাৎ টিআরএম কার্যকর করার সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। টিআরএম চালু না করে শুধু নদী খনন করা হলে দ্রুত নদী পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাবে এবং সরকারের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুই বছর আগে আমডাঙা খাল সংস্কারের সিদ্ধান্ত, টেন্ডার ও অর্থ বরাদ্দ হওয়া সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম আটকে আছে। এছাড়া আইডব্লিউএম কর্তৃক প্রস্তুতকৃত স্থায়ী সমাধানের রূপরেখা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা এখনও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেনি।
সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সাথে প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করে এলাকা পরিদর্শনের নিমন্ত্রণ জানালেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি মেলেনি। আগামী ৫ অক্টোবর বর্বরোচিত পুলিশি হামলার স্মরণে 'ভবদহ দিবস' উপলক্ষে অভয়নগর উপজেলা চত্বর থেকে আমডাঙ্গা খাল পর্যন্ত পদযাত্রা ও সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ৪টি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়। যার মধ্যে রয়েছে, আগামী মাঘী পূর্ণিমার আগেই ভবদহ অঞ্চলে জোড়াতালি না দিয়ে কার্যকর 'টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট' (টিআরএম) বা জোয়ারাধার চালু করা। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমডাঙ্গা খালের বিস্তৃত পুনর্খনন ও প্রশস্তকরণ কাজ জরুরিভিত্তিতে সম্পন্ন করা। ভবদহ অঞ্চলের সকল নদী ও খাল থেকে কচুরিপানা, নেট-পাটা এবং কৃত্রিম বাঁশ বা মাটির বাঁধ অপসারণ করে মুক্ত পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা। ২০১৬ সালের ৫ই অক্টোবর নওয়াপাড়ায় সংগ্রাম কমিটির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলাকারীদের বিচারে আনা।
দ্রুত পানি নিষ্কাশন করে কিছু জমিতে হলেও ফসল আবাদের সুযোগ তৈরি করতে পাউবো (পানি উন্নয়ন বোর্ড) ও সেনাবাহিনীর প্রতি ১০টি নির্দিষ্ট বাধা অপসারণের দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, পাচাকড়ি-রাজবংশীপাড়ার পাশের বাঁধ অপসারণ, টেকার বেইলি ব্রিজ ও বন্ধ মূল টেকা ব্রিজের নিচে এলজিইডি কর্তৃক নির্মিত মাটির বাঁধ অপসারণ, ভবদহের ২১ গেটের সামনের লোহার বেড়া অপসারণ অথবা দু'পাশ থেকে অন্তত ১০-১২ হাত কেটে ফেলা, ভবদহের ৯ গেটের উৎস মুখ ও ভবদহ কলেজের পাশের কাঠের ব্রিজের তলা কেটে দেওয়া, কপালিয়া ব্রিজের মূল সমস্যাযুক্ত পাশ কেটে সচল করা এবং কপালিয়া বাজারের পাশের বাঁধটি অপসারণ করা। শোলগাতি ব্রিজের নিচের পাকা ঢালাই অপসারণ এবং টেকা ব্রিজ থেকে অবশিষ্ট ৪ কিলোমিটার অংশে ভাসমান স্কেভেটর দিয়ে জরুরি খনন শুরু করা।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা তসলিম-উর-রহমান, সদস্য শিবপদ বিশ্বাস, সুকেন্দু বিশ্বাস, রাজু আহম্মেদ, বাসন্তী মণ্ডল, সনঞ্জয় বৈরাগী, ভগীরত হালদার, আনন্দ বাবু, আব্দুর রওফ বিশ্বাস, মিরান তরফদার, আলমগীর হোসেন, আনিচুর রহমান ও সতীশ মল্লিক প্রমুখ।