ধ্রুব নিউজ ডেস্ক
থানায় ওসির সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান এমপি রুমিন ফারহানা ছবি: সংগৃহীত
দুর্গাপূজার সময়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা না পাওয়া এবং নানা অনিয়মের অভিযোগে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে বসেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ ও বাগবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন স্থানীয় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। গত বৃহস্পতিবার রাতে সরাইল থানায় ঘটা এই আকস্মিক ঘটনায় পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
থানা সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তার সমর্থক ও স্থানীয় লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে সরাইল থানায় প্রবেশ করেন। পূজা চলাকালীন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা না দেওয়া, ফোন কল রিসিভ না করা এবং থানার কার্যক্রমে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি সরাসরি ওসির কক্ষে প্রবেশ করেন এবং তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় সংসদ সদস্যের সমর্থকরা থানার ভেতরে ও বাইরে ভিড় জমিয়ে স্লোগান দিতে শুরু করলে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ওসির কক্ষে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, “কতবার অনুরোধ করেছি নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য! বিজয়নগর ও আশুগঞ্জেও আমাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্য স্থানীয় এলাকায় নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রাখেন। গাইবান্ধায় সংসদ সদস্য নিহত হওয়ার পরই মূলত এই আইনটি করা হয়েছে। অথচ ওসি সাহেব ফোনই ধরেন না এবং উল্টো বলেন যে, আমি নির্বাচিত এমপি, তাই সাধারণ মানুষই আমাকে নিরাপত্তা দেবে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “এজন্যই তো দেখতে পাচ্ছেন, বাইরে হাজার হাজার মানুষ আমার নিরাপত্তার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ওসির বিরুদ্ধে মাটি কাটা, বালু ও ইটভাটা থেকে চাঁদা আদায়সহ দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। আমাদের এই এলাকাটি দাঙ্গা-প্রবণ; অথচ কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে ওনারা পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার অনেক পরে ধীরেসুস্থে ঘটনাস্থলে যান। আজ এসব বিষয়ে কথা বলতেই আমি থানায় এসেছিলাম। কিন্তু একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সঙ্গে ওনার এই ধরনের আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক।”
তবে সংসদ সদস্যের এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া। পাল্টা অভিযোগ করে তিনি জানান, রুমিন ফারহানা শতাধিক অনুসারীকে নিয়ে থানায় প্রবেশ করে বিশৃঙ্খল ও বিব্রতকর পরিবেশ তৈরি করেছিলেন।
ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, “উনি কিছু লোক শিখিয়ে এনেছিলেন, যারা আমার বিরুদ্ধে মনগড়া ও ভিত্তিহীন কথা বলেছেন। আমাকে জড়িয়ে দাবি করা হয়েছে যে আমি নাকি কোনো এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে গিয়ে ভাত খেয়েছি। অথচ আমি রাষ্ট্রীয় ও সরকারি প্রটোকল ছাড়া কোনো ধরনের দাওয়াতে বা খাবারে কখনো যোগ দিই না।”
মামলার আসামি ছাড়ানোর বিনিময়ে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ওসি বলেন, “যে লোকটিকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করানো হয়েছে, তাকে আমি জীবনেও দেখিনি। নিয়ম অনুযায়ী আসামিরা থানায় আসে, পুলিশ তাদের কোর্টে পাঠায়; এ ক্ষেত্রে আমার কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকে না। এছাড়া আমাদের এলাকায় তো কোনো ব্রিকফিল্ডই নেই, কারণ এটি সম্পূর্ণ হাওড় অঞ্চল এবং বর্ষায় সব ডুবে থাকে। তাহলে উনি এমন অবাস্তব অভিযোগ কোথায় পেলেন?”
নিরাপত্তার বিষয়ে ওসি আরও জানান, “পূজার পুরো সময়ে আমরা অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মাধ্যমে প্রতিটি মণ্ডপ নিরাপদে রেখেছি। তবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গানম্যান বা বিশেষ প্রটোকল চাইলে তা এসপি মহোদয়ের দপ্তরে আবেদন করতে হয়, যার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। পুলিশের সীমিত জনবল দিয়ে একজন এমপির পেছনে সার্বক্ষণিক দল নিয়োজিত রাখা সম্ভব নয়। অথচ তিনি দলবল নিয়ে এসে আমার কক্ষ অবরুদ্ধ করেন এবং থানায় একধরনের মব জাস্টিসের পরিবেশ তৈরি করেন।”
ঘটনার সময় থানার বাইরে সংসদ সদস্যের শত শত সমর্থক ওসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্তক অবস্থান নেয় এবং বিশৃঙ্খলাকারীদের ভিডিও ধারণ করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষমহলে বিষয়টি নোট করা হয়েছে বলে থানা সূত্রে জানানো হয়েছে। দুর্গাপূজার ঠিক মাঝপথে জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের এই মুখোমুখি অবস্থান স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।