ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহী সফরের সময় গত মঙ্গলবার রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) একটি বাসে চড়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই ছবি ফেসবুকে দেখে আবু বকর সিদ্দিক (২২) নামের যুবক মন্তব্য করেছিলেন-‘ইস! একটা বড় সুযোগ। শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল।’
এ ঘটনার জেরে বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে অভিযান চালিয়ে আবু বকর সিদ্দিককে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া তার বাবা আয়নাল হককেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তারা এখন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হেফাজতে আছেন।
আবু বক্করকে আটক করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)–৫। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রাজশাহীর পবা থানার পারিলা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আবু বক্করকে আটক করা হয়।
আবু বক্করের বাড়ি রাজশাহীর কচুয়াতৈল গ্রামে। বাবার নাম আয়নাল হক।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রাজশাহী সফর করেন। তাঁর সফরের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা হয়। এই পোস্টে বাজে মন্তব্য করেন আবু বক্কর। তাঁর পরিচয় শনাক্ত করতে রাজশাহী মহানগরের চন্দ্রিমা থানা পুলিশ, এসআরবি, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), সিটিএসবি ও সিআরটি কাজ শুরু করে। পরিচয় শনাক্তের পর এসআরবির সদস্যরা তাঁর বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদে বাবা জানান, আবু বক্কর তাঁর মামার বাড়িতে আছেন।
পরে এসআরবি-৫ রাজশাহী ব্যাটালিয়নের একটি দল পবা থানার পারিলা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর এলাকায় আবু বক্করের মামার বাড়িতে অভিযান চালায়। আবু বক্করকে আটক করা হয়।
অভিযুক্ত আবু বকরের বাড়ি রাজশাহীর চন্দ্রিমা থানার কেচুয়াতৈল এলাকায়। তার বাবা আয়নাল হক পেশায় কৃষক। তার চার ছেলে-মেয়ে। একমাত্র ছেলে আবু বকর সিদ্দিকই সবার বড়। তিনি রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রী কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র বলে জানা গেছে।
এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, পড়াশোনার পাশাপাশি ভ্যানে সবজি পরিবহনের কাজ করেন আবু বকর সিদ্দিক। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। তিনি এলাকায় ভালো ছেলে হিসেবে পরিচিত। আবু বকর বাইকারদের দলের সঙ্গে যুক্ত। বাইক নিয়ে একসঙ্গে দূর-দুরান্তে ঘুরে বেড়ান।
আবু বকরের মা আসমাউল হুসনা দাবি করেন, তার ছেলে নিরীহ, পরিশ্রমী এবং মেধাবী। তাকে এই ঘটনার সঙ্গে ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে গেলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বুধবার দুপুর ২টার দিকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও চন্দ্রিমা থানা-পুলিশের একটি দল তার বাড়ি যায়। এ সময় আবু বকরকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা তার অবস্থান জানাতে চাননি। পরে বিকেল ৪টার দিকে এসআরবি-৫ এর একটি দল সাদাপোশাকে তার বাড়িতে অভিযানে যায়। আবু বকরকে না পেয়ে তারা তার বাবা আয়নাল হককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে আয়নাল হক জানান, জেলার পবা উপজেলার হাটরামচন্দ্রপুর ঘোলহারিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে আত্মগোপন করে আছে তার ছেলে। পরে এসআরবি সদস্যরা তার বাবাকে নিয়েই সেই বাড়িতে অভিযানে যান। সেখান থেকেই আবু বকর সিদ্দিককে আটক করা হয়। ওই অভিযানে আবু বকর সিদ্দিক, তার বাবা আয়নাল হককে আটক ও পরিবারের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। আটকের পর দুজনকে ডিএমপির ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা এখন ঢাকায় আছেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে নগরের চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম অভিযুক্ত যুবকের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী তল্লাশি চালিয়েও জব্দ করার মতো কোনো আলামত পায়নি পুলিশ। শুধু একটি পেনড্রাইভের মোড়ক জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ আবু বকর সিদ্দিকের ল্যাপটপ উদ্ধারের চেষ্টা করেছে। তবে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, আবু বকর সিদ্দিক ল্যাপটপ ব্যবহার করতেন না। তার ল্যাপটপ নেই।
রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রী কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম জানান, আবু বকর সিদ্দিক কলেজের নিয়মিত ছাত্র। তিনি প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছেন। তবে এখনও ফলাফল হয়নি। কলেজে তিনি আবু বকর সিদ্দিকের খারাপ কিছু দেখেননি। তিনি জানান, ফেসবুকে তাঁর মন্তব্যের বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা তাকে জানিয়েছেন যে, আবু বকর সিদ্দিকের বাবা আগে আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তিনি জামায়াতের সঙ্গে মিশছেন। আবু বকর পারিবারিক সূত্রে ছাত্রলীগ করতেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে কলেজে কিছু দেখেননি।
রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রী কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মাহমুদ হাসান লিমন বলেন, ‘আমি প্রশাসনের লোকজনের কাছে শুনলাম যে আবু বকর আগে ছাত্রলীগ করত। এখন নাকি ছাত্রশিবির করছে। কিন্তু কলেজে আমি কোনো কিছু দেখিনি। তাকে আমরা সেভাবে চিনতামও না।’
জানতে চাইলে ছাত্রশিবিরের রাজশাহী মহানগরের সভাপতি ইমরান নাজির বলেন, ‘এখন কিছু হলেই শিবিরের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার একটা অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক আমাদের জনশক্তি না।’
চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, আবু বকর আগে কখনও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কি না সে রকম কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তার নামে কোনো মামলা আছে কি না সে তথ্যও পাওয়া যায়নি। আর তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সম্পর্কেও কিছু জানা যায়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
গত মঙ্গলবার রাজশাহী এসে বিমানবন্দর থেকে মাদ্রাসা ময়দান, সেখান থেকে ধর্মসভা হয়ে আবার বিমানবন্দরে যাতায়াতের সময় রুয়েটের বাস ব্যবহার করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় রাস্তার দুই ধারে অসংখ্য মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা জানায়। প্রধানমন্ত্রীও এতে সাড়া দেন।
পরে ‘দ্য বিউটি অব রাজশাহী’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রধানমন্ত্রীর ওই বাসে বসে থাকার একটি ছবি পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টটির মন্তব্যের ঘরে আবু বকর সিদ্দিক নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়, ‘ইস! একটা বড় সুযোগ ছিল শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল।’