ধ্রুব ডেস্ক
সোমবার (২৫ মে) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারের ‘১০০ দিন পূর্তি’ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: সংগৃহীত
জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রথম ১০০ দিনে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত, দৃশ্যমান ও কার্যকর বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন বলে জানানো হয়েছে। সোমবার (২৫ মে) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারের ‘১০০ দিন পূর্তি’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই প্রতিটি অগ্রাধিকারভিত্তিক নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রকাঠামো একযোগে লক্ষ্য স্থির করে কাজ করে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভা ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মোট ১০টি ক্যাবিনেট (মন্ত্রিসভা) সভা সম্পন্ন করেছে। এসব সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে; যার মধ্যে ৩৭টি সিদ্ধান্ত (প্রায় ৬২ শতাংশ) এরইমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৩টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও কৃষি খাতের অগ্রগতি তুলে ধরে জানানো হয়, প্রথম মাসেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে নারীকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের জন্য সম্মানী প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জনদুর্ভোগ লাঘবে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া প্রথম ক্যাবিনেট (মন্ত্রিসভা) বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ এবং ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করতে দেশজুড়ে ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে জানানো হয়, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৭১ শতাংশে নেমে এসেছে। বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ সফলভাবে জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া সফলভাবে ৯০ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে ১০টি দেশের মধ্যে তিনটি দেশের সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের আস্থায় মাসিক রেমিট্যান্স এরইমধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং তাদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ কলকারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।
শিক্ষা ও প্রযুক্তির বিষয়ে বলা হয়, অনার্স (স্নাতক) পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায় থেকে সব শিক্ষার্থীর মাঝে স্কুল ড্রেস, জুতা এবং পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ বিতরণের পাইলট (পরীক্ষামূলক) প্রকল্প আগামী জুলাই মাসে প্রতিটি উপজেলার একাধিক স্কুলে একযোগে শুরু হবে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আগামী মাস থেকে ‘স্টার্ট-আপ ফান্ড’ (নতুন উদ্যোগ তহবিল) কার্যকর হবে। এছাড়া দেশের প্রায় দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র।
আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতির উদাহরণ হিসেবে শিশু রামিসা হত্যাচেষ্টার দ্রুত চার্জশিট দাখিল, মেহেরপুরে শিশু ধর্ষণের মামলায় মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং এক দশক পর তনু হত্যা মামলার প্রথম আসামিকে গ্রেফতারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বীরদের আইনি সুরক্ষা দিতে জাতীয় সংসদে ‘জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইন’ পাস করা হয়েছে। আহত শতাধিক যোদ্ধাকে রাশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ইকোনমিক করিডোর (অর্থনৈতিক অঞ্চল) এবং আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল (তৃতীয় ভবন) উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ২৫০টি পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক (বৈদ্যুতিক) বাস চালুর উদ্যোগ এবং মেট্রোরেল ও ট্রেনে প্রবীণ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভাড়ার ওপর ২৫ শতাংশ ছাড় আজ থেকে কার্যকর করা হয়েছে।
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অত্যাধুনিক ‘গ্রাউন্ড মাস্টার-৪০০’ রাডার স্থাপন করা হয়েছে, যা ঢাকা থেকে ৬৫০ কিলোমিটার এবং বঙ্গোপসাগরে ৮৩৩ কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশসীমা নজরদারিতে রাখছে। পাশাপাশি সীমান্তে ড্রোন, অ্যান্টি-ড্রোন ও মাইন ডিটেক্টর (খনি শনাক্তকারী) স্থাপনের মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্টে পূর্বের ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি পুনর্বহালের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ভিভিআইপি (গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রী প্রটোকলের গণ্ডি ভেঙে সাধারণ মানুষের দুয়ারে পৌঁছাচ্ছেন, যা মানবিক ও জনমুখী রাজনীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।