ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: এআই‘র তৈরি
বাংলাদেশের অর্থনীতি এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি, রপ্তানি আয়ে ধস এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই সমস্যা প্রকট হচ্ছে দিন দিন। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়ছে। একই সাথে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। একদিকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ে বড় অংকের ঘাটতি—সব মিলিয়ে অর্থনীতির হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশে মূল্যবৃদ্ধি না করার সিদ্ধান্তে সরকারকে বিশাল অংকের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের শেষ চার মাসে (মার্চ-জুন) ডিজেল ও অকটেনে ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় হবে ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল ডিজেলেই ভর্তুকি দিতে হবে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। জ্বালানির এই ভর্তুকি চাপের ফলে উন্নয়ন বাজেটে টান পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে(জুলাই ’২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ’২৬) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। ৩লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ২লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। যদিও গত অর্থবছরের তুলনায় আদায়ের প্রবৃদ্ধি ১২.৩৬ শতাংশ, কিন্তু সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আগামী চার মাসে এনবিআরকে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা আহরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে এটা একপ্রকার অসম্ভব।
সরকারের ব্যয় নির্বাহে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে আট মাসে সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ৯৮ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে তিন গুণ বেশি। বিপরীতে, বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে খরা। ৯৬ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও প্রথম সাত মাসে বিদেশি উৎস থেকে ছাড় হয়েছে মাত্র ৯ হাজার কোটি টাকা।
রপ্তানি আয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। টানা আট মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে। গত মার্চ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আয় কমেছে ১৮.৭ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সামগ্রিক রপ্তানি কমেছে ৪.৮৫ শতাংশ।চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই–মার্চ) দেশের মোট রপ্তানি আয় কমে ৩৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ অংক ছিল ৩৭ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার।
নানা সংকটের মধ্যেও ভরসা হয়ে আছে রেমিট্যান্স। গত মার্চ মাসে রেকর্ড ৩৭৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। মূলত ঈদুল ফিতর এবং যুদ্ধের আতঙ্কে অনেকে জমানো টাকা দেশে পাঠিয়ে দেওয়ায় এই জোয়ার এসেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন শ্রমিক পাঠানো বাধাগ্রস্ত হবে এবং বর্তমান কর্মীদের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সরকারের বিদেশি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় বিদেশি ঋণের পরিমাণ ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন করে বিদেশি উৎস থেকে দুই বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার উদ্যোগের কথা জনিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারের আয় ও ব্যয়ের অংকের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স কমলে অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হবে। এ অবস্থায় রিজার্ভ থেকে অর্থ উত্তোলন বা টাকা ছাপানোর মতো ঘটনা ঘটলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।
অন্যদিকে, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সরকার তিন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে থাকলেও অর্থ না ছাপিয়ে বিনিয়োগ ও সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আশ্বস্ত করেছেন যে, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে জনমনে যে উৎকণ্ঠা রয়েছে, তা দূর করতে সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষি কার্ডের মতো জরুরি উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে সরকারকে ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে। যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে আগামী দিনগুলোতে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ধ্রুব/টিএম