Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

নববর্ষ : নবজীবনের গান

জুবায়ের হুসাইন জুবায়ের হুসাইন
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল,২০২৬, ১২:৪০ এ এম
আপডেট : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল,২০২৬, ০২:০২ এ এম
নববর্ষ : নবজীবনের গান

মরা সাধারণত পহেলা বৈশাখই বলে থাকি। আমরা আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছি আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজি থেকে। ‘বোশেখ’ শব্দটি আমাদের ছড়া ও কবিতায় ব্যবহৃত হয় ছন্দ, মাত্রা ও অন্তঃমিলের প্রয়োজনে।

পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। বাংলা ১৪৩২ সাল শুরু হয়েছে এই ১লা বৈশাখ দিয়েই। ঈসায়ী ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিলে ১লা বৈশাখ। ঈসায়ী সালকে আমাদের দেশে অনেকেই ইংরেজি সাল বলে। এই বলাটা ঠিক নয়, এই ইংরেজি বা ইং বলাটা মারাত্মক ভুল। এটা ইংরেজি ভাষা বা ইংরেজদের কোনো বিষয় নয়। এটা হযরত ঈসা (আ)-এর বিষয়। খ্রিস্টানদের বিষয়। এ কারণে অনেকে ঈসায়ী সালকে খ্রিস্টাব্দ বলে, যেমন বাংলা সালকে বলে বঙ্গাব্দ। হযরত ঈসা (আ)-কে খ্রিস্টানরা তাদের নবী হিসেবে মান্য করে, আমরা মুসলমানরাও তাঁকে নবী হিসেবে মান্য করি। এ কারণে তারা বলে খ্রিস্টাব্দ আর আমরা বলি ঈসায়ী সাল। দুটোই ঠিক। কারণ সকল খ্রিস্টান তো ইংরেজ নয়, আবার সকল ইংরেজ তো খ্রিস্টান নয়। গোটা খ্রিস্টান জগৎ শুধু নয়, সারা দুনিয়া এখন ঈসায়ী সাল অনুযায়ী জীবন-যাপন করে। সে কারণে একে ইংরেজি সাল বলা অনুচিত। খ্রিস্টান জগতের সবাই ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে না। এবং ইংরেজ বলতে শুধু ব্রিটিশদের বোঝায়, বোঝায় শুধু ইংল্যান্ডবাসীদের। তাই এখন থেকে এই ভুলটি আমাদের না করা উচিত।

বর্তমানে বাংলা নববর্ষে ইংরেজি বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে হয়। ১৪ এপ্রিলই পহেলা বোশেখ। আগে এ নিয়ে বেশ বিপাকে পড়তে হতো। যেহেতু ইংরেজি ও বাংলা উভয় সন সূর্য বছর, সেহেতু এ দু’য়ের মাঝে আগে যে বেশ কয়েকদিনের পার্থক্য ছিলো এখন তা নেই। কয়েক বছর আগে সরকার একটি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এই প্রমিত দিবস হিসেবে ১৪ এপ্রিলকে পহেলা বৈশেখ করে দিয়েছেন।

বঙ্গদেশে (বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ) বছরের শুরু বৈশাখের প্রথম দিন। কবে থেকে এর প্রচলন, তা নিয়ে মতভেদ আছে। বেশিরভাগ পণ্ডিতের মতে, বাংলা সাল চালু হয় সম্ভবত আরবি নয়শ’ হিজরির দিকে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দু’জন মুসলিম শাসকের নাম। একজন বাংলার সুলতান হোসেন শাহ, অন্যজন মোগল সম্রাট আকবর। ৯০৩ হিজরি অর্থাৎ ৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে হোসেন শাহের রাজত্বের শুরু। তখন থেকেই হিজরি বা চান্দ্র বছর অনুসারে নতুন করে বঙ্গাব্দের সূচনা। অনেকের মতে, বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করেন সম্রাট আকবর। মতান্তরে, বাংলা সাল সম্পর্কে যে হস্তলিপি পাওয়া গেছে তা প্রমাণ করে বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের ঘটনা আরও আগের। তবে বেশিরভাগ পণ্ডিতের মতেই, হোসেন শাহই বাংলা সালের প্রকৃত প্রবর্তক। আকবরের সময় তা পেয়েছে শাসনতান্ত্রিক সালের মর্যাদা। তিনি প্রজা ও কৃষকদের মধ্যে ঋণ বিতরণ, খাজনা আদায় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে বাংলা বর্ষপঞ্জিকে কার্যকর করেন।

চৈত্র মাসের শেষে বাঙালিদের ঘরে ঘরে ফসল আসে বলে এই সময়টাকে নববর্ষ পালনের সময় হিসেবে নির্ধারণ করেন তিনি। ফসল এলে মানুষের মন ভালো থাকে, মানুষের মনে আনন্দ জাগে, মানুষের মনে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়, - এসব কারণেই চৈত্র মাসের শেষে নববর্ষের আয়োজন।

হাতে টাকা-পয়সা না থাকলে কারোর মন ভালো থাকে না। চৈত্রের শেষে ফসল বিক্রি করে বাংলাদেশের কৃষকরা কিছু টাকা-পয়সা আয় করে। ঘরে তখন ফসল। ফসলের ঘ্রাণে ভরপুর ঘর-আঙিনা, ঠিক সে সময় আসে নববর্ষ। মন-প্রাণ আনন্দে ভরপুর থাকার কারণে বাংলাদেশে মানুষ নববর্ষকে স্বাগত জানায়। নববর্ষকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করে।

অতীতে বাংলাদেশের মানুষ নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পালন করতো না। পালন করতো চৈত্রসংক্রান্তি। চৈত্রসংক্রান্তি পালন করতো চৈত্র মাসের শেষ ৩ দিন বা ৭ দিন। গরিব অঞ্চলের মানুষ পালন করতো ৩ দিন এবং ধনী অঞ্চলের মানুষ পালন করতো ৭ দিন। সনাতন ধর্মের অনুসারীরাই এসব উৎসব পালন করতো। এসব উৎসবে থাকতো নানা ধরনের পূজা-অর্চনা, ভোজ, হালখাতা ও মেলাসহ নানা রকম আনন্দ-উৎসব।

বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে ষষ্ঠ শতাব্দীতে অর্থাৎ ৬০০ ঈসায়ীতে। পরিপূর্ণ ৫০০ শ’ বছর ইসলামের দাওয়াত তথা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রচারিত হওয়ার পর ১২০০ ঈসায়ী সালের প্রথম দিকে বাংলাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলমানরা চৈত্রসংক্রান্তি পালন করতো না, তবে চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় যোগ দিত এবং আনন্দ-উৎসব করতো। তারা পূজা-পার্বণ থেকে দূরে থাকতো। তারা রথে উঠতো না, চর্কিতে উঠতো না। ধর্মসংক্রান্ত খেলাধুলায় তারা অংশগ্রহণ করতো না। তবে, হালখাতার মিষ্টি খেতে কেউ দ্বিধাও করতো না।

ষোড়শ শতাব্দীতে নববর্ষ ঘোষণার পর বাংলার মুসলমান নববর্ষ পালন করতে শুরু করে। এর আগে নববর্ষ বলতে বাংলাদেশে কিছু ছিল না। আগেই বলা হয়েছে তখন ছিল চৈত্রসংক্রান্তি। মুসলমানরা নববর্ষের সময় মিলাদ, দোয়া, কাঙালি ভোজ, মসজিদে শিরনি বণ্টন, কুরআনখানি ইত্যাদির মাধ্যমে নববর্ষকে স্বাগত জানায়। তারাও পর্যায়ক্রমে হালখাতা শুরু করে এবং সার্বজনীন মেলায় পূর্বের মতো অংশগ্রহণ করতে থাকে।

চৈত্রসংক্রান্তি শেষে সনাতন ধর্মের অনুসারীরা তথা হিন্দু ধর্মের লোকেরা নববর্ষ পালন করে ১৫ এপ্রিল। মুসলিমরা পালন করে ১৪ এপ্রিল। বিষয়টি এখনও গ্রামে-গঞ্জে সুস্পষ্ট। দুই সম্প্রদায়ের লোক দু’দিনে নববর্ষ পালন করে। এ নিয়ে তেমন কোনো অসুবিধা কখনও হয়নি। উৎসব এবং উৎসবের আমেজ দীর্ঘায়ু হয়েছে মাত্র। বাংলাদেশের মানুষ উৎসবপ্রিয় বলে বিষয়টিকে বিভেদ বা বিভাজন হিসেবে দেখেনি। দেখেছে সহানুভূতির সাথে, দেখেছে সহমর্মিতার সাথে।

বর্তমানে শহরে-বন্দরে যেভাবে নববর্ষ পালন করা হচ্ছে, আগে সেভাবে পালন করা হতো না। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে নিজ নিজ ঐতিহ্য নিয়ে এবং নিজ নিজ সংস্কৃতি নিয়ে নববর্ষ পালন করতো। যেমন মুসলমানরা পালন করতো মহান আল্লাহতা’য়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং তাঁর কাছ থেকে দয়া, করুণা ও রহমতের আশা নিয়ে। এ কারণে তারা মিলাদ, কুরআনখানি, দোয়া, ওয়াজ মাহফিল ইত্যাদির আয়োজন করতো। এসবের মাধ্যমে তারা পরম করুণাময় আল্লাহতা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে চাইতো। ধর্মীয় অনুষ্ঠান মনে হলেও আসলে এসব ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আমাদের সংস্কৃতি ধর্মের দ্বারা গঠিত বলে ধর্মের উপাদান এ সংস্কৃতিতে প্রবল।

একদিনের বাঙালি না সেজে সারা বছরের জন্য বাংলাদেশী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার এটাই দিন। আমরাও যে কোনো একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারি- ‘বাংলায় কথা বলার’, ‘বাংলাদেশকে ভালোবাসবো’, ‘সবুজ ধ্বংস করবো না’, ‘মানুষকে ভালোবাসবো’। তবে হ্যাঁ, কাগুজে সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়োজন বাস্তব আয়োজনের। যেমনটি দেখা গেছে এবারের পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রায়। সাম্প্রদায়িকতার আবর্তে নিমজ্জিত “মঙ্গল শোভাযত্রা”র অবসান ঘটিয়ে “নববর্ষের আনন্দ শোভাযাত্রা” নামকরণ ও পালন আমাদেরকে নতুনভাবে আশান্বিত করেছে।

আলেমদের একটি অংশ এসব অনুষ্ঠানকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বলে বিবেচনা করায় এবং এসবকে ‘বিদআত’ বলে ঘোষণা করায় ধীরে ধীরে ঐ সব অনুষ্ঠান-আয়োজন থেকে মুসলমানরা দূরে সরে পড়ে। ফলে নববর্ষ পালন উপলক্ষে শহরে-বন্দরে এখন আর ধর্মীয় আদলটিই নেই। আছে গড়পড়তা অন্যের দেখাদেখি অনুকরণ এবং অনুশীলন। যে ছেলে ও মেয়েটি আগে নামাজ-কালাম পড়ে এবং বাড়ির বা মহল্লার মিলাদে অংশগ্রহণ করে পরে সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতো, সে এখন সেজে-গুজে সরাসরি সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছে, ফলে সে তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে কোনো কিছু অবহিত হতে পারছে না। এ এক শূন্যতা। কিন্তু স্বাভাবিত নিয়মে কোনো শূন্যতায় শূন্য হয়ে থাকে না। এই শূন্যতা তাই অন্য সংস্কৃতি দিয়ে পূরণ হচ্ছে।

অন্যান্য ধর্মের মানুষ নিজস্ব ধর্মের সাথে স্থানীয় সংস্কৃতিকে মিলিয়ে সবার মাঝে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। একেই তারা বলছে সার্বজনীন উৎসব। এই উৎসবে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সবাই একাকার হয়ে যোগ দিচ্ছে।

গ্রামগঞ্জের অবস্থা অবশ্য ভিন্ন। সেখানে যে যার ধর্ম ও ঐতিহ্য নিয়ে এখনও নববর্ষ পালন করে। কিন্তু গ্রামতো আর গ্রাম থাকছে না, শহর-বন্দরের সংস্কৃতি গ্রামে এসে অচিরেই ধাক্কা দেবে। সেই ধাক্কা সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে হয়।

পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ পালন আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। স্থানীয় সংস্কৃতিকে ইসলাম কখনও অবজ্ঞা করেনি, বরং স্বাগত জানিয়ে পরিশুদ্ধ করার থাকলে তাই করেছে। তাই আমাদের উচিত অত্যন্ত সুন্দর ও নির্মলভাবে দিবসটি পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়া। এখন আমরা যে উদ্দামতা ও যে উচ্ছ্বাস নিয়ে ১লা বৈশাখ পালন করছি, তা যে শূচি-শুদ্ধ, পরিচ্ছন্ন ও নির্মল নয়, তা আমরা সবাই উপলব্ধি করি, কিন্তু কেন যেন জাতিগতভাবে পরিচ্ছন্ন, অনাবিল, স্বচ্ছ ও সুন্দর কর্মসূচি আমরা প্রণয়ন করতে পারছি না।

আর এভাবেই ঘুরে ঘুরে-আসে নতুন বছর। আসে একের পর এক ‘গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত-শীত ও বসন্ত।’ ছয়টি ঋতু ছয়টি রূপে এসে আমাদের উঠানে ডাকাডাকি করে। জীবনকে আমরা নানাভাবে নানা রঙে দেখতে পাই।

মেলা, উৎসব আনন্দের পাশাপাশি নতুন বছর কিন্তু নতুন অভিযাত্রারও সূচনা। প্রতিটি নতুন বছরই কিন্তু আমাদের জন্য বয়ে আনে নবজীবনের বারতা।

‘ঝরে গেছে ঝরার যা তা

ফুটবে আবার নতুন পাতা’।

আমাদের জীবনের শাখে শাখে নতুন পাতা গজানোর দিন যেন এই পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ। অনেকেই কিন্তু নববর্ষে নতুন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

আমরা যারা বাংলা নববর্ষে হইচই করে, বাসন্তী শাড়ি পরে, টোপর লাগিয়ে, সং সেজে, বটমূলে পান্তা খেয়ে একদিনের উৎসবে মেতে উঠি তাদের কিন্তু ভাবনার দিন এসে গেছে। একদিনের বাঙালি না সেজে সারা বছরের জন্য বাংলাদেশী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার এটাই দিন। আমরাও যে কোনো একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারি- ‘বাংলায় কথা বলার’, ‘বাংলাদেশকে ভালোবাসবো’, ‘সবুজ ধ্বংস করবো না’, ‘মানুষকে ভালোবাসবো’। তবে হ্যাঁ, কাগুজে সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়োজন বাস্তব আয়োজনের। যেমনটি দেখা গেছে এবারের পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রায়। সাম্প্রদায়িকতার আবর্তে নিমজ্জিত “মঙ্গল শোভাযত্রা”র অবসান ঘটিয়ে “নববর্ষের আনন্দ শোভাযাত্রা” নামকরণ ও পালন আমাদেরকে নতুনভাবে আশান্বিত করেছে। এ পরিবর্তন ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট বিপ্লবেরই একটি অনুসঙ্গ।

এবার নববর্ষে তাই আমরা গ্লানিমুক্ত, এক সুন্দর জীবনের স্বপ্নে মেতে উঠি, জীবনকে সাজাই সব নতুন স্বপ্ন ও সৃষ্টির প্রত্যয়ে।

‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো...’ এই গানের সাথে সাথে উচ্চারণ করি, ‘মানুষেরে ভালো তুমি বেসো হে...’।

 

লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

*মতামত লেখকের নিজস্ব

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)