Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

ফেলে দেওয়া জিনিসের হাট: যেখানে আবর্জনাও হয়ে ওঠে অমূল্য সম্পদ

সাইফুল ইসলাম সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন,২০২৬, ১২:২১ পিএম
ফেলে দেওয়া জিনিসের হাট: যেখানে আবর্জনাও হয়ে ওঠে অমূল্য সম্পদ

চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো ধুলোবালি, মরচে পড়া লোহা আর ভাঙাচোরা প্লাস্টিকের ছড়াছড়ি। ছবি: ধ্রিুব নিউজ

একনজরে দেখলে মনে হবে এক গাদা আবর্জনার স্তূপ। চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো ধুলোবালি, মরচে পড়া লোহা আর ভাঙাচোরা প্লাস্টিকের ছড়াছড়ি। চট করে দেখলে যে কেউ ভাববেন, এগুলো শহরের কোনো এক কোণের পরিত্যক্ত ময়লার ভাগাড়। কিন্তু একটু ভালো করে তাকালেই চোখ কপালে উঠবে। আমাদের প্রতিদিনের চেনা জীবনের যেসব জিনিস অকেজো বা অপ্রয়োজনীয় ভেবে আমরা ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলি কিংবা ভ্রাম্যমাণ ভাঙারির দোকানে সস্তা দরে বেচে দিই, সেগুলোকে ধুয়ে-মুছে নতুন জীবন দিচ্ছেন এক ব্যবসায়ী। যশোর শহরের টাউন হল মাঠ সংলগ্ন পৌর হকার্স মার্কেটের এই ব্যতিক্রমী দোকানের মালিক জাহিদ হাসান। দীর্ঘ ১০-১২ বছর ধরে এই ব্যবসার সাথে জড়িয়ে আছেন তিনি। অতীতে ভ্যান চালিয়ে ফেরি করলেও কঠোর পরিশ্রম আর সততার হাত ধরে আজ তিনি এই স্থায়ী দোকানটি গড়ে তুলেছেন, যা এখন তার ৬ জনের পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস।

জাহিদ হাসানের এই দোকানে ঢুকলে মনে হবে, মানুষের কল্পনায় যত রকমের জিনিস আসতে পারে—তার প্রায় সবই যেন এখানে এসে জমা হয়েছে। চেনা পৃথিবীর চেনা হিসাবগুলো এই দোকানে এসে এক নিমেষে বদলে যায়। এখানে কী নেই? নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে শৌখিন সামগ্রী—সবই মিলবে এক ছাদের নিচে। দোকানে গেলেই দেখা যাবে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে হরেক রকমের মোবাইল ও লাইটের চার্জার, ছোট-বড় গাড়ি, ঘরের সুইচ বোর্ড, মোটরের হেলমেট, এমনকি খেলোয়াড়দের ব্যবহৃত ক্রিকেটের প্যাড বা গার্ড পর্যন্ত। আবার সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের সাধ্যের মধ্যে মেলে হরেক রকম শাড়ি ও পুরনো পোশাক-আশাক।

শুধু কি দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস? এই আবর্জনার স্তূপের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এমন অনেক পুরনো জিনিস, যা এখনকার দিনে রীতিমতো 'অ্যান্টিক' বা দুর্লভ। আধুনিক বাজারে এখন আর খুঁজলেও পাওয়া যায় না এমন সব বিলুপ্তপ্রায় টেপরেকর্ডার, পুরনো আমলের এনালগ ফিল্ম ক্যামেরা, ক্যাসেট কিংবা ক্ল্যাসিক ডিজাইনের দেয়াল ঘড়িও এখানে খুব সহজে চোখে পড়ে। শৌখিন মানুষরা তাই মাঝেমধ্যেই এখানে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঢুঁ মারেন। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—নিজেদের শোবার ঘর বা ড্রয়িংরুম সাজানোর জন্য হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রাচীন বা দুর্লভ জিনিস একদম কম দামে খুঁজে বের করা।

এই বিশাল মালামালের সংগ্রহের পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। শহরের একদল অভাবী মানুষ প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার ময়লার ড্রাম, ড্রেন কিংবা ভাগাড়ের স্তূপ থেকে এসব জিনিস কুড়িয়ে নেন। আপাতদৃষ্টিতে নষ্ট, নোংরা বা কাদামাখা মনে হওয়া এই জিনিসগুলো তারা অত্যন্ত যত্ন সহকারে ধুয়ে, মুছে, পরিষ্কার করে জাহিদ হাসানের দোকানে নিয়ে আসেন। তিনি তাদের এই পরিশ্রমের সঠিক মূল্য দিয়ে ওজনে কেজি দরে কিংবা বস্তা হিসেবে এগুলো কিনে নেন।

এরপর শুরু হয় এই মালামালগুলো বিক্রির মূল পালা। শহরের বিভিন্ন মেকানিক বা মিস্ত্রিরা যখন তাদের মেরামতের কাজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট পার্টস বা ভাঙা যন্ত্রাংশ খুচরা বাজারে চড়া দামেও খুঁজে পান না, তখন তাদের শেষ ভরসা হয় এই দোকান। নামমাত্র মূল্যে এখান থেকে পুরনো নষ্ট ট্রাইপড বা স্ট্যান্ডের অংশবিশেষ কিনে নিয়ে তারা নিজেদের বুদ্ধি দিয়ে জোড়াতালি দেন এবং সচল করে তোলেন অন্য কোনো সচল যন্ত্রকে। যন্ত্রাংশের পাশাপাশি জাহিদ হাসান মাত্র ১০-১৫ টাকা পিস হিসেবে পুরনো কাপড় কেনেন। অনেক সময় বিভিন্ন বাসা-বাড়ি বা পরিচিত কাস্টমাররা তাকে ফ্রিতেও কাপড় দিয়ে যান। এগুলো মূলত নিম্নআয়ের ও দরিদ্র মানুষেরা কিনে নিয়ে যান এবং মেরামত করে পরিধান করেন। এমনকি মেলা বা ফুটপাতের দোকানের জন্য মাত্র ২০ টাকা খরচে পুরনো প্যান্ট নতুন করে রঙ করিয়ে পাইকারি দরে বিক্রি করার কাজটিও করেন তিনি।

আমাদের কাছে যা স্রেফ ময়লা বা বর্জ্য, তা-ই জাহিদ হাসানের হাত ধরে আবার নতুন রূপ নিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে ফিরে যাচ্ছে। এই কুড়িয়ে আনা আর ফেলে দেওয়া জিনিসগুলো কেনাবেচা করেই জাহিদ হাসানের সংসার আজ সুন্দরভাবে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন তিনি সংসারে ৩০০ টাকা করে দেন। জাহিদ হাসান বলেন, "সব মিলিয়ে আল্লাহ আল্লাহর রহমতে খুব ভালো রাখছেন। এই কুড়িয়ে আনা আর ফেলে দেওয়া জিনিসগুলো কেনাবেচা করেই আমার সংসার সুন্দরভাবে চলে যাচ্ছে।"

এতে যেমন কম খরচে নিম্নআয়ের মানুষের বড় ধরণের উপকার হচ্ছে, তেমনি লাভবান হচ্ছেন শহরের শৌখিন মানুষেরাও। সবচেয়ে বড় কথা, এই বিচিত্র মালামাল কেনাবেচার মাধ্যমে আমাদের চারপাশের পরিবেশের এক বিশাল উপকার হচ্ছে। যে প্লাস্টিক, কাচ বা ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য পরিবেশের সাথে মিশে মাটিকে বিষিয়ে তুলতে পারত, তা আবার নতুন করে মানুষের ব্যবহারে আসছে।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)