সাইফুল ইসলাম
এক ফ্রেমে সবাই ছবি: ধ্রুব নিউজ
ছবি আঁকার খাতার এক কোণে হয়তো সবুজ একটা ঘাস ফড়িং, কিংবা অন্য কোথাও ঘরের চাল ঘেঁষে একটা অদ্ভুত রঙের আকাশ। চেনা সিলেবাস কিংবা নিয়মের গণ্ডি পেরিয়ে শিশুরা নিজের মতন করে যেভাবে এই পৃথিবীকে দেখে, ঠিক সেই ভাবনার এক পশলা রঙ এখন খেলা করছে ক্যানভাসে। প্রয়াত শিল্পী ও শিক্ষক সোহেল প্রাণন (১৯৭৮-২০২২) স্মরণে যশোর শহরের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ‘চারুপীঠ’-এ আজ শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে শিশু আঁকিয়েদের এক অন্যরকম চিত্র প্রদর্শনী। ‘ইচ্ছেগুলো আঁকে’ শিরোনামের এই আয়োজনটি আগামী ২০ জুন পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রদর্শনীর সমাপনী দিনে আগামী ২০ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় অনুষ্ঠিত হবে একটি বিশেষ আয়োজন, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'প্রাণের পরে প্রাণ'। এই পর্বে শিশুদের আঁকা ছবি নিয়ে একটি সচিত্র উপস্থাপন করবেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ও প্রদর্শনীর অন্যতম কিউরেটর শিল্পী সান্ত্বনা শাহরিণ।
এবারের প্রদর্শনীর সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো, এখানে স্থান পাওয়া ছবিগুলোর ওপর কোনো অভিভাবক বা শিক্ষকের তুলির আঁচড় পড়েনি। শিশুরা প্রায় এক বছর সময় নিয়ে সম্পূর্ণ নিজেদের মতন করে, নিজের আনন্দে এই ছবিগুলো এঁকেছে। প্রদর্শনী এবং শিশুদের এই মুক্ত চিন্তা সম্পর্কে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা স্কুলের সহকারী অধ্যাপক এবং ‘কণিকা আর্টিস্ট গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সান্ত্বনা শাহরিণ বলেন, প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘ইচ্ছেগুলো’ রাখা হয়েছে মূলত বাচ্চাদের মনের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতে। প্রায়ই দেখা যায় অভিভাবকরা নিজেদের ইচ্ছে বা স্বপ্নগুলো বাচ্চাদের ওপর চাপিয়ে দেন। কিন্তু বাচ্চারা হয়তো সাধারণ একটা ঘাস-ফুল নিয়ে পড়ে থাকতে চায়, নিজের মতো করে আকাশকে অন্য রঙে দেখতে চায়। এই আয়োজনে আমরা তাদের সেই ভাবনার স্বাধীনতার জায়গাটা দিতে চেয়েছি।
প্রদর্শনীতে ঘুরে দেখলে বোঝা যায়, শিশুদের এই কাজগুলোর মধ্যে যেন বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোর ঘরানা ও সমসাময়িক চিন্তার এক দারুণ মেলবন্ধন ঘটেছে। অনেক সাধারণ দর্শকের চোখে এই ছবিগুলো হয়তো ‘অসমাপ্ত’ মনে হতে পারে, কিন্তু শিল্পের ব্যাকরণ এখানে একদম ভিন্ন। পিকাসো যেমন একটিমাত্র রেখায় একটা আস্ত ছবি সম্পূর্ণ করতেন, শিশুদের এই লাইন ড্রয়িংগুলোও ঠিক তেমনই একেকটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পকর্ম। এই খুদে শিল্পীরা তাদের ছবিতে সমসাময়িক প্রযুক্তি আর নিজেদের আবেগকে খুব সুন্দরভাবে মিশিয়ে নিয়েছে। কেউ একজন ফুটবল খেলার মাঠ এঁকেছে ঠিকই, কিন্তু মাঠের চরিত্রগুলোকে সাজিয়েছে আমাদের চেনা মুঠোফোনের আধুনিক ‘ইমোজি’র আদলে। শুধু রং-পেনসিল নয়, ছবিগুলোতে স্থান পেয়েছে পেপার কোলাজ, মাটির কাজ এবং তাদের চারপাশের চেনা পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক জগৎ। কোনো আর্ট স্কুলের বাঁধাধরা নিয়ম না জানা অনেক সাধারণ শিশুর অসাধারণ সব কাজও এই প্রদর্শনীকে সমৃদ্ধ করেছে।
এই সুন্দর আয়োজনটি মূলত চারুপীঠ ও কণিকা আর্টিস্ট গ্রুপের একটি যৌথ প্রয়াস। নিজের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা স্কুলের সহকারী অধ্যাপক শিল্পী সান্ত্বনা শাহরিণ বলেন, তিনি নিজেও একসময় এই চারুপীঠের খুদে শিল্পী ছিলেন। পরবর্তীতে শান্তিনিকেতন থেকে প্রিন্ট মেকিংয়ে মাস্টার্স করে এখন শিক্ষকতা করছেন। তার প্রয়াত শিক্ষক ও শিল্পী সোহেল প্রাণনের সাথে যৌথ স্বপ্নের কথা মনে করে তিনি বলেন, শিল্পী সোহেল প্রাণন আমার শিক্ষক ছিলেন। আমাদের স্বপ্ন ছিল ‘কণিকা আর্টিস্ট গ্রুপ’ গড়ার, যেখানে ছবি আঁকার কোনো বাঁধাধরা নিয়ম থাকবে না। আমরা সবাই স্বাধীন এবং আমাদের চিন্তার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই—এই আনন্দটাই আমরা শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি। প্রদর্শনীর উদ্বোধনী দিনে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট যশোরের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীম এবং চারুপীঠের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদসহ স্থানীয় সংস্কৃতিজন ও সাধারণ অভিভাবকেরা। শিশুদের মনের গহীনের এই ভিন্নধর্মী ও মনস্তাত্ত্বিক কাজগুলো দেখার জন্য যশোরের সর্বস্তরের মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আয়োজকেরা।