ধ্রুব ডেস্ক
২৩ মে ময়মনসিংহে প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি করেছে তোলপাড় ছবি: সংগৃহীত
রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই—এই প্রবাদটি কি আবার সত্যি হতে চলেছে? ৫ আগস্টের সেই রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান, ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ, আর রাজপথের বিজয়ের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল জনগণ, তার ভেতরেই কি এখন দানা বাঁধছে কোনো গোপন সমীকরণ? ২৩ মে ময়মনসিংহে প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি করেছে তোলপাড়, যেখানে তিনি বলেছেন—৫ আগস্ট যাদের এদেশের মানুষ বিতাড়িত করেছিল, তাদের সঙ্গে এখন তলে তলে খাতির শুরু হয়েছে একটি দলের। শুধু তাই নয়, এই খেলায় যুক্ত হয়েছে নতুন কয়েকটি সুন্দর সুন্দর ছোট লেজ। ১৯৮৬ কিংবা ১৯৯৬ সালের সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মেরুকরণের ইতিহাস টেনে কেন এই সতর্কতা? আসলেই কি পর্দার আড়ালে কোনো গোপন সমঝোতা চলছে কিনা—এসব বিষয়ে টিবিএসের সাথে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এটা আমি মনে করি এটা সম্পূর্ণই একটা রাজনৈতিক বক্তব্য। এবং প্রধানমন্ত্রী... আমি বুঝতে পেরেছি যে তিনি এই কথাটা কেন বলছেন, কাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন। ওনার এই বক্তব্যের সত্যতা আছে বলে আমার মনে হয় না এবং সেই সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় এখনই শুরু হয়নি। তবে এটাও সত্য যে রাজনীতিতে ওই যে শেষ কথা বলতে কিছু নাই, সেটা আপনারাও বোঝেন, পাবলিকও বোঝে সব সময়। তো এইটা নিছকই আমি মনে করি যে এইটা একটা ওনার একটা মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে তিনি একটা মেসেজ দিলেন, কিন্তু এটা খুব দুর্বল মেসেজ। এই অর্থে এই মেসেজের—এটা খুব বস্তুনিষ্ঠ কোনো মেসেজ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। কারণ যদি সেই গোপন আতাঁতের বিষয় উনি ইঙ্গিত করেই থাকেন, তাহলে তো এটা উল্টাভাবে এটাও হতে পারে যে তাহলে ওনারা তো এই যে নির্বাচনটা করলেন, সেই নির্বাচনে যে ভোট পেলেন, সেই ভোটের একটা তো বিরাট অংশ তো তাদের ভোট রয়েছে, বা যেটা এই ক্ষমতাসীন দল সম্পর্কে শোনা যায়, তারা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের একটা ব্লেসিংস তারা পেয়েছে আরকি। সরাসরি না পেলেও তারা তো সেই ব্লেসিংসটা পেয়েছে। সো, এইটা আসলে আমি খুব সিরিয়াসলি নিতে চাই না ওনার এই বক্তব্যকে। এটা নিছকই তিনি বিরোধী দলকে, বিরোধী দলের রাজনীতিকে দুর্বল করার জন্য তিনি একটা মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। এবং এই কৌশলটা খুব দুর্বল কৌশল, এই কৌশল পাল্টা ওনাকেও আঘাত করতে পারে, পারার সুযোগ আছে।’
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ১৯৮৬ এবং ৯৬ সালের উদাহরণ দিয়েছেন। এ বিষয়ে ড. সাব্বির আহমেদ, বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতের মধ্যে আতাঁতের বিষয়টিই আসলে উনি ইঙ্গিত করেছেন। হ্যাঁ, যদি পরিস্থিতি সেদিকে যায়, তবে সেদিকে তো হতেও পারে। এটা গোপনে হবে কেন, সেটা হলে প্রকাশ্যেই হতে পারে। কারণ যদি বিএনপি ১৭ বছর আওয়ামী লীগ যা করছে, তারা যদি সেই একই কায়দায় শাসন শুরু করে, তাহলে তো যেকোনো সময় সেই আতাঁত হতে পারে। সেই আতাঁত যে হতে পারে না, সেটা গোপনে হওয়ারও দরকার নাই, সেটা প্রকাশ্যেই হতে পারে। আমি মনে করি আরকি, রাজনীতিতে ওই যে শেষ কথা বলতে যেহেতু কিছু নাই, সংগত কারণেই সম্ভাবনাকেও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
৮৬ এবং ৯৬ সাল দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পট পরিবর্তনের সময়কার যে কথাটি বলছিলেন, এটি দিয়ে আসলে তিনি কোনো কৌশলগত ভুলের দিকে ইঙ্গিত করতে চাচ্ছেন কিনা এ বিষয়ে ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘সেটা তো ভুল-শুদ্ধ, এখন কৌশল যতক্ষণ পর্যন্ত আতাঁত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটা ভুল... আতাঁতটা কি ভুল হলো না শুদ্ধ হলো, সেটা জাজমেন্ট করা যাবে না তো। এটা তো একেবারেই—মানে এই বক্তব্যটিই বস্তুনিষ্ঠ না এবং তথ্য-প্রমাণের কোনো ভিত্তি নাই এটার। ঐতিহাসিক একটা অনুমান থেকে তিনি সেই কথাটা ছুড়ে দিয়েছেন। তো আমার মনে হয় না যে এইটা খুব একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তিনি দিয়েছেন। তা ছাড়া এইটা এই সময়ে এই প্রশ্ন একেবারেই মানে অপ্রাসঙ্গিক এই মুহূর্তে আরকি। একটা অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য তিনি সামনে নিয়ে এসেছেন। ঐরকম কোনো গ্রাউন্ড রিয়েলিটিও কিন্তু তৈরি হয় নি এখন পর্যন্ত।’
প্রধানমন্ত্রী আজকে বলেছেন এখানে আসলে নতুন কয়েকটি সুন্দর ছোট ছোট লেজ গজিয়েছে। রাজনৈতিক পরিভাষায় এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই নতুন লেজ বলতে আসলে কাদের বোঝানো হচ্ছে? ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘ ওই তো বোঝাই যাচ্ছে উনি কাদেরকে বলতে চাইছেন। হ্যাঁ, এখনো তো এনসিপি (NCP) ওই জায়গায় তো যায়নি, যে একটা সরকার বিরোধী আন্দোলনে গিয়ে সেই সরকারকে একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফেলে দিবে। গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটটা ছিল আলাদা, এখন ওই ধরনের—সেইটা তো আর আবার ঘুরে আসার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখি না। তবে যে সরকার বিরোধী আন্দোলনের যে ইঙ্গিতটা দিয়েছেন, সেই জায়গায়, সেই অবস্থা তৈরি করার মতো জায়গায় এখনো এনসিপি নাই। মানে সেটা করতে গেলে তাদের যে প্রস্তুতি থাকা দরকার সেটাও নাই। ওই ধরনের চিন্তাভাবনা তারা তো করছেন বলে তো আমার মনে হয় না। তারা তো সমালোচনার জায়গায় তো করবেনই, তারা তো বিরোধী দলে, তারা সমালোচনা করবেন এটাই তো স্বাভাবিক। তো সমালোচনাকে যদি আপনি নিতে না পারেন সেটা সমস্যাটা আপনার। আমি তো মনে করি তারা যে সমালোচনাগুলো করছেন, যে বক্তব্যগুলো তারা দিচ্ছেন, সেগুলো তো অযুক্তিক না সব। আমরা তো মনে করি এগুলো যৌক্তিক। সুতরাং সমালোচনা করলেই তারা আতাঁতের বিষয় নিয়ে বিরোধী দলকে কাবু করার চেষ্টা করবেন, এই অস্ত্রটা খুবই দুর্বল অস্ত্র উনি ব্যবহার করছেন।’
যে প্রধানমন্ত্রী যে আশঙ্কা করছেন তার গ্রাউন্ডে এখনো তৈরি হয়নি। কিন্তু যদি ধরা হয় আসলে 'তলে তলে খাতির' এটি সত্যি হচ্ছে—তবে আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে? এ প্রশ্নের জবাবে ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘খাতির করার যত স্কোপ, বাস্তবসম্মত যদি খাতির করার বিষয় থাকে আওয়ামী লীগকে খাতির করার, সেটা সরকারি দলের পক্ষেই সেই খাতির করা সম্ভব। বিরোধী দলের পক্ষে এটা করা সম্ভব না। হ্যাঁ, সরকারি দলেই তাদেরকে সেই সুযোগ করে দিতে পারে খাতির করার। সুতরাং খাতিরের প্রশ্ন আসাটা একেবারেই অবান্তর এই মুহূর্তে আরকি। হ্যাঁ, কারণ সামনের যে নির্বাচন আসতেছে মনে করেন স্থানীয় নির্বাচন, সেই নির্বাচন তো একটা টেস্ট কেস। কে কার সাথে খাতির করতেছে, সেটা কিন্তু আমরা জাতীয় নির্বাচনে দেখছি। খুব আসলে খাতিরটা কে কার সাথে করছে। খাতিরের বেশিরভাগ সুবিধা কে পাইছে, তার চেয়ে কম সুবিধা কে পাইছে, সেটা তো আমরা দেখছি। তো সেটা তো খাতির তো এক ধরনের না থাকলে তো সেটা হতো না। সুতরাং এই খাতির যে অব্যাহত থাকবে না তাদের পক্ষ থেকে, সেটা তো কোনো গ্যারান্টি নাই। এই খাতির তো সরকারি দলের পক্ষ থেকেও হইতে পারে, হ্যাঁ, সেটা সরকার বিরোধী না হোক, সেটা মানে সকল রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য তারা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা যে আওয়ামী লীগকে দেবে না, মানে সেটা বলার সময় এখনো আসে নি।’( টিবিএস পডকাস্ট থেকে অনুলিখন)