সাইফুল ইসলাম
একজন গাছি গাছ তুলছেন। ছবি: ধ্রুব নিউজ
ঋতুচক্রে শীতের আগমনের এখনো ঢের বাকি। এরমধ্যে যশোরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভেসে আসছে দা দড়ির পরিচিত শব্দ। বাণিজ্যিক রস গুড় উৎপাদনের সাথে যুক্ত গাছিরা এখনই ব্যস্ত সময় পার করছেন খেজুরগাছ প্রস্তুতের কাজে। শীত নামার আগেই গাছের ডালপালা ছাঁটা এবং মাথা চেঁছে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলা শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে।
এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে খেজুরের রস ও গুড়ের ভূমিকা বিশাল। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিগত শীত মৌসুমে কেবল এই খাত ঘিরেই প্রায় ১২০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয় এখানে। বহু মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। অনলাইনে অর্ডার নিয়ে দেশজুড়ে গুড় পাঠাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এমনকি বিশ্ববাজারে এই গুড় ও সিরাপ রপ্তানির চিন্তাও করা হচ্ছে।

ছবি - ধ্রুব নিউজ
তবে কোটি টাকার এই বাণিজ্যের পেছনের চিত্রটা পুরোপুরি স্বস্তির নয়। গাছিরা বলছেন, এবার খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এক মণ জ্বালানি কাঠ কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকায়। একটি ভালো দা কিনতে লাগছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চাল-ডালের চড়া দাম। অথচ একটি গাছ থেকে পুরো মৌসুমে মাত্র ৭ থেকে ৮ কেজি গুড় পাওয়া যায়। খরচ যেভাবে বাড়ছে, তাতে না জানি শেষ পর্যন্ত কী হয়!
সরেজমিনে দেখা যায়, গাছিরা খেজুরগাছের পুরোনো ডালপালা পরিষ্কার করা, গাছের মাথা চাঁচা বা চেঁছে প্রস্তুত করা এবং রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলার কাজে মগ্ন। গাছ প্রস্তুতের এই প্রাথমিক ধাপ শেষে নির্দিষ্ট সময় পরপর হাঁড়ি বসিয়ে সংগ্রহ করা হবে খেজুরের মিষ্টি রস। পরে সেই রস বিশেষ পদ্ধতিতে জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু গুড় ও পাটালি।
খাজুরার এই রস ও গুড় কেবল খাদ্যসংস্কৃতির অংশই নয়, এটি এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য এবং শত শত গাছির প্রধান জীবিকার উৎস। প্রতিবছরই খাঁটি পাটালিগুড় ও টাটকা রসে মুখরিত হয় এ অঞ্চলের শীতকালীন বাজার। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে খেজুরগাছের সংখ্যা হ্রাস, নতুন গাছির অভাব এবং অনাবশ্যক বা উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ছবি - ধ্রুব নিউজ
গাছিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সঠিক সময়েই গাছ প্রস্তুতের কাজ শুরু করা গেছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পাশাপাশি গুড় তৈরির উপকরণের দাম অত্যাধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
গাছিরা আক্ষেপ করে বলেন, "গাছে ওঠানামা অনেক কষ্টের কাজ। এ বছর চাল, ডাল ও ভোজ্যতেলসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। তা ছাড়া গাছ কাটার দা, জ্বালানি কাঠ ও মাটির হাঁড়ি-ঠিলের দামও এবার অনেক বেশি। প্রতি মণ কাঠ কিনতেই ২০০ টাকা লাগছে, আর একেকটি দা কিনতে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা লাগছে। সারাজীবনে বা সারা মৌসুমে একটি গাছ থেকে মাত্র ৭-৮ কেজি গুড় পাওয়া যায়। গুড়ের সঠিক বা ন্যায্যমূল্য না পেলে আমাদের এই কষ্ট বৃথা যাবে এবং সংসার চালানো দায় হয়ে পড়বে।"
তবে পণ্যের গুণগত মান নিয়ে তারা আপস করছেন না। অন্য এক গাছি জানান, "আমাদের এলাকার ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি হলো বিশুদ্ধতা। কোনো প্রকার আবর্জনা বা মশার প্রাদুর্ভাব এড়াতে আমরা অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে কাঠ-খড়ি দিয়ে রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করি। এখানকার পাটালি ওপরে শক্ত কিন্তু ভেতরে রসালো থাকে, যা দেশের বাইরেও প্রবাসী ও ভোজনরসিকদের কাছে বেশ সমাদৃত।"

ছবি - ধ্রুব নিউজ
এদিকে জেলায় খেজুরগুড়কে কেন্দ্র করে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সমরেন বিশ্বাস বলেন, "এ অঞ্চল থেকে শীত মৌসুমে গুড় খাত ঘিরে প্রায় ১২০ কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক লেনদেন বা টার্নওভার হয়। বর্তমানে বহু অনলাইন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন, যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই গুড় ও পাটালি পৌঁছে দিচ্ছেন।"
তিনি আরও জানান, "ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে আধুনিক উপায়ে টিকিয়ে রাখতে গবেষণার মাধ্যমে গাছ কাটার আধুনিক সরঞ্জাম ও উন্নত পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাজারে খেজুরের গুড় ও রসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ইতোমধ্যেই বিসিক খেজুরের রসের লিকুইড সিরাপ ও ঝোলা গুড়ের মান নির্ধারণ এবং বিএসটিআই এর লাইসেন্স অনুমোদনের জন্য কাজ শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পণ্য রপ্তানি শুরু হলে স্থানীয় গাছি ও উদ্যোক্তারা আরও লাভবান হবেন।"
সব মিলিয়ে, উৎপাদন খরচ ও আনুষঙ্গিক সংকটের মধ্যেও খাজুরার গাছিরা আশা করছেন—চলতি মৌসুমে ভালো আবহাওয়া এবং উৎপাদিত গুড়ের ন্যায্যমূল্য পেলে তারা তাদের দীর্ঘদিনের এই লোকঐতিহ্য ও জীবিকাকে সাফল্যের সঙ্গেই এগিয়ে নিতে পারবেন।