ধ্রুব নিউজ ডেস্ক
উঠান পাঠশালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন বুনছেন নুরুল করিম ছবি: সংগৃহীত
অর্থনৈতিক সংকট, ভালো প্রস্তুতির সুযোগের অভাব কিংবা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার অভাব—প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নভঙ্গের নেপথ্যে এই বাধাগুলো যেন পুরনো চিত্র। কিন্তু নীলফামারী সরকারি কলেজের শিক্ষক নুরুল করিমের হাত ধরে সেই চিত্র এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। কোনো বাণিজ্যিক কোচিং বা নির্দিষ্ট ফি ছাড়াই তিনি গড়ে তুলেছেন ‘উঠান পাঠশালা’। আর এই অনন্য উদ্যোগের ছোঁয়ায় প্রতিবছর নীলফামারীর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখছেন প্রাউম্য ৫০ জন শিক্ষার্থী।
করোনা মহামারির সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যখন বন্ধ ছিল, তখন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা সচল রাখতে অভিনব এক উদ্যোগ নেন নুরুল করিম। কখনো বাড়ির উঠানে মাদুর পেতে, কখনো আবার বাড়ির ছাদে কিংবা খোলা মাঠে শুরু হয় তাঁর পাঠদান। সেই থেকে এই উদ্যোগের নাম পায় ‘উঠান পাঠশালা’, যা মূলত পরিচিত ছিল ‘ড্রিম টু ডিইউ’ নামে। এই কার্যক্রমে প্রধানত অংশ নেন নীলফামারী সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এখানে কেবল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিই নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলা এবং উচ্চশিক্ষার সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই ছিল মূল লক্ষ্য।
এই পাঠশালার সাফল্য অভাবনীয়। শিক্ষক নুরুল করিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখান থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। কোনো কোনো বছর এই সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রতিবছর গড়ে ১২ থেকে ১৩ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পান। এমনকি কোনো কোনো ব্যাচ থেকে একাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিলেন প্রায় ১৬ জন শিক্ষার্থী। কেবল ২০২৩ সালের ব্যাচ থেকেই বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছিলেন ৬০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী।
এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে অনেক অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প। ২০২১ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ৯৪.২০ নম্বর পেয়ে মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন এই পাঠশালারই শিক্ষার্থী মো. ফরিদুল। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটে তাঁর অবস্থান ছিল ১০৬তম। এছাড়া ২০১২ সালে ফয়সাল মাহদী সবুজকে বিনা মূল্যে পড়ানোর মধ্য দিয়ে এই মহৎ যাত্রার সূচনা হয়েছিল, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের একজন সার্জেন্ট।
নুরুল করিমের নিজের জীবনও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়া। বরিশালের হিজলা উপজেলার এক নদীবেষ্টিত প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান তিনি। ছোটবেলায় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মাঝেও শিক্ষকদের নিঃস্বার্থ সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। সেই শৈশবের কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই পরবর্তী সময়ে নিজের সরকারি বেতনের ওপর ভর করে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পরও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের লড়াই থামে না। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে নুরুল করিম কেবল ভর্তি পরীক্ষাই নয়, শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকট মোচনেও পরম অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অর্থাভাবে পড়াশোনা বন্ধ হতে বসা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ করে দিয়েছেন তিনি। এমনকি এক ছাত্রীর উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে তিনি জোগাড় করেছিলেন দেড় লাখ টাকা।
নুরুল করিমের এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগের সুফল আজ কেবল তাঁর প্রচেষ্টাতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীরাও ছুটির দিনে বাড়িতে এসে নতুনদের পড়াতে শুরু করেছেন। আবির, রাকিব, ইভান ও বাদশাহদের মতো তরুণেরা এই সহযোগিতার ধারাকে টিকিয়ে রেখেছেন, যার মধ্যে প্রথম দুজন এখন কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন।
নুরুল করিমের ‘উঠান পাঠশালা’ আজ কেবল কিছু তরুণের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতি কেন্দ্র নয়; এটি প্রান্তিক অঞ্চলের তরুণদের চোখে বড় স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক অনন্য ইতিহাস।
সূত্র: জাগো নিউজ